শেষ পর্যন্ত সাকিব আল হাসানও — সাজেদুল চৌধুরী রুবেল

0
406
Shajedul Chowdhury Rubel
সাজেদুল চৌধুরী রুবেল, Irish Bangla Times

শ্রমিকদের ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার আগেই তাদের মজুরি পরিশোধ করে দেয়ার জন্য হাদিসে সুস্পষ্ট ভাবে নির্দেশ রয়েছে। অথচ এই শ্রমিকরা যুগ যুগ ধরে নিস্পেষিত, শোষিত হয়ে আসছে। সময় মতো তারা তাদের বেতন ভাতা পাননা। উপযুক্ত পারিশ্রমিকও প্রদান করা হয়না। যাদেরকে দিয়ে একটি শ্রেণী টাকার পাহাড় গড়ে তোলেন তাদেরকেই উপযুক্ত হিস্যা দিতে ওই শ্রেণীটির যতো টালবাহানা। শ্রমিকদের প্রতি এ টালবাহানা সারা বিশ্বেই কমবেশি পরিলক্ষিত হয়। তবে আমাদের দেশের মতো এতো অবিচার, অন্যায় আচরণ আর কোনো দেশে খুঁজে পাওয়া ভার।

পত্র পত্রিকার রিপোর্ট বা বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (BIOLS) এর বিভিন্ন সময়ের জরিপের উপর দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে আমাদের দেশে শিল্প খাতে বছরে কম করে হলেও প্রায় ২০০টির মতো শ্রমঅসন্তোষ বা বিরোধের ঘটনা ঘটে থাকে। যার ফলে শ্রমিকদেরকে প্রায়ই সভা সমাবেশ, বিক্ষোভ, মানব বন্ধন, সড়ক অবরোধ, হরতাল, ধর্মঘটের মতো আন্দোলনের আশ্রয় নিতে হয়। এসব আন্দোলন কর্মসূচির অধিকাংশই হয়ে থাকে বিশেষ করে বকেয়া বেতনের দাবিতে। করোনা আতংকের এ মহামারী লগ্নেও আমরা এ ধরনের আন্দোলন দেখতে পাচ্ছি। শ্রমিকদেরকে রাস্তায় নামতে হচ্ছে তাদের বেতন ভাতা আদায়ের জন্যে। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব আন্দোলন বেশ জোড়ালো ভাবে দানা বেঁধে উঠে যা আমরা বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ও টিভিতে দেখেছি। সরকারের ঘোষিত লকডাউন ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতিকে উপেক্ষা করেই তারা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয়। সরকারের এ আদেশকে অমান্য করা হয়তো তাদের ঠিক হয়নি। কিন্তু তাদেরকে দোষ দিয়েই বা কি লাভ! ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। পেটে ভাত না থাকলে মুখে শরম রেখে লাভ কি! করোনায় মৃত্যুর চেয়েও না খেয়ে মৃত্যুর যন্ত্রণা আরও অনেক বেশি। তাই তারা করোনা ঝুঁকি মাথায় নিয়েই আন্দোলন করে যাচ্ছে যা কিনা অপাংক্তেয় মনে হলেও অস্বাভাবিক নয়।

শ্রমিকদের বেতনাদি পরিশোধের ক্ষেত্রে গড়িমসি করা অধিকাংশ মালিকদের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার আয় করতে সক্ষম হলেও শিল্প খাতের ওইসব মালিকরা তাদের ঐ স্বভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। কুস্বভাবগ্রস্থ এসব ধূর্ত মালিকদের খাতায় শেষপর্যন্ত এবার নাম লিখালেন আমাদের সবার প্রিয় ক্রিকেট তারকা সাকিব আল হাসান।

সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেডের শ্রমিক মনোয়ারা বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে ভালোভাবে জীবনযাপনের জন্য এই কাঁকড়ার ফার্মে কাজ করি। কিন্তু গত চার মাস বেতন বন্ধ থাকায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতিতে ঘরে খাবার না থাকায় ছেলে-মেয়ে নিয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছি। শ্রমিক মহিদুল ইসলাম বলেন, চার মাস ধরে আমাদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। করোনা প্রাদুর্ভাবে কঠিন অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। নারী শ্রমিক রহিমা বেগম বলেন, অভাবের তাড়নায় সন্তান ও পরিবার ফেলে এসে প্রজেক্টে কাজ করেছি। ঠিকমতো বেতন না পাওয়ায় করোনা প্রাদুর্ভাবে খুবই কষ্টে আছি।

সাকিবের ফার্মে কর্মরত কয়েকজন শ্রমিকের অভিযোগ গুলো ঠিক এভাবেই তুলে ধরেন গত ২০ এপ্রিল ২০২০ তারিখের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত “৪ মাস ধরে শ্রমিকদের বেতন দেননা ক্রিকেটার সাকিব” শিরোনামে একটি রিপোর্টে। রিপোর্টটি পড়ে আরও যা জানা গেছে তা হলো, সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মাসুদ মোড়ে ক্রিকেট অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান প্রতিষ্ঠিত ‌সাকিব আল হাসান অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেডের শ্রমিকদের ৪ মাস ধরে বেতন দেওয়া হচ্ছেন না। বারবার সময় নিয়েও বেতন না দেওয়ায় বাধ্য হয়ে সোমবার (২০ এপ্রিল) সকালে ফার্মের দুই শতাধিক শ্রমিক আন্দোলনে নামেন ও বেতনের দাবিতে বিক্ষোভ করেন।

যারা শেয়ালের মতো ধূর্ত, সারা জীবন টাকা, টেন্ডার আর টার্গেটের পেছনে দৌড়ে বেড়ায় ওরাই সাধারণত শ্রমিকদেরকে ঠকায়, শ্রমিকদের সাথে প্রতারণা করে। এ ঠগবাজ প্রতারক শ্রেণীটি জাতগত ভাবেই ব্যবসায়ী। ওরা ব্যবসাটা ভালোই বুঝে। ব্যবসা ভালো বুঝে উঠা শ্রেণীটির সাথে পাল্লা দিয়ে সাকিবের মতো তারকা খেলোয়াড় কিভাবে একই নৌকায় পা দেয় তা আমার বোধগম্য নয়। তারকারা সাধারণত সাবলীল মনের অধিকারী হয়ে থাকে। আর দশটা ব্যবসায়ীর সঙ্গে তাদের তুলনা চলেনা। সারা বিশ্বে যখন এমন দুর্যোগ মুহূর্তে সাকিব শ্রেণীর লোকেরা হাজার হাজার কোটি টাকা ত্রাণ দিয়ে বেড়াচ্ছে সেখানে যদি খোদ সাকিবের কোম্পানির শ্রমিকদের বকেয়া বেতনের দাবিতে রাস্তায় নামার খবর বাতাসে ভেসে বেড়ায় তবে তা বড়োই পীড়াদায়ক। এটা শুধু সাকিবের জন্যই লজ্জা নয়, এ লজ্জা পুরো দেশের, পুরো জাতির।

লেখাটি এ পর্যন্ত লিখতেই আজ সকালে (২২/০৪/২০২০) সাকিব আল হাসানের একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস আমার নজরে আসে যা আমাদের সময়.কমে প্রকাশ পায়। সেখানে তিনি মিডিয়াকে কিছুটা দোষারোপ করে তার উপরে আঙ্গুলায়িত অভিযোগ খন্ডানোর চেষ্টা করেন। দীর্ঘ স্ট্যাটাসের মাধ্যমে তিনি বুঝাতে চেয়েছেন যে, অন্য অনেক ফার্মের মতো এ ফার্মের সাথে ও তার নাম সরাসরি যুক্ত আছে বটে তবে এসব দেখভাল করার দায়িত্বে তিনি নেই। অন্যান্য মালিক বা অংশীদারদের দ্বারাই এগুলো পরিচালিত হয়ে থাকে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, শ্রমিক অসন্তোষের ব্যপারে তিনি কিছুই জানতেননা। শুধু এটুকু জানতেন, এ বছরের জানুয়ারি মাসে অব্যাহতি দেয়া এসব কর্মচারীদেরকে ৩০ এপ্রিল ২০২০ তারিখের মধ্যে বেতনাদি মিটিয়ে দেয়া হবে। সে পর্যন্ত অপেক্ষা না করে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে আসায় তিনি বিস্মিত হন এবং অন্যান্য মালিক বা অংশীদারদের সাহায্যের তোয়াক্কা না করে তাৎক্ষণিক ভাবেই তার ব্যক্তিগত তহবিল থেকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধ করে দেন।

সাকিব আল হাসানের বক্তব্যের রেশ ধরে বলতে হয় প্রথমত, যেহেতু তারই নামে ফার্মটি সেহেতু কে পরিচালনা করছে তা দেখার বিষয় নয়। ফার্মের সুনাম বা বদনাম তার উপরই অর্পিত হবে। কোনো অজুহাতেই তিনি এর দায়ভার থেকে মুক্ত হতে পারেননা। দ্বিতীয়ত মিডিয়াকে দোষারোপ করে তিনি যে মন্তব্য করেছেন তাও সঠিক নয়। মিডিয়াতে খবরটি প্রকাশ পেয়েছে বলেই তিনি বিষয়টি অবগত হতে পেরেছেন এবং খবরটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে তাৎক্ষণিক শ্রমিকদেরকে নিজস্ব তহবিল থেকে বকেয়া বেতন পরিশোধ করতে সক্ষম হয়েছেন। তৃতীয়ত কাউকে অব্যাহতি দিলে তাৎক্ষণিক তিন মাসের বেতনাদি দিয়ে তাকে সাধারণত বিদায় করতে হয়। অথচ আগ্র ফার্মের শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তা না করে উল্টো তাদেরকে ঝুলিয়ে রাখা হলো। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টের পর তাৎক্ষণিক তিনি যেভাবে নিজস্ব তহবিল থেকে শ্রমিকদেরকে বেতন ভাতা পরিশোধ করেছেন ওই কজটিই কেনো তিনি চার মাস আগে করেননি? এটাকি তার শ্রমিকদরদী মনোভাব? নাকি মিডিয়ায় প্রকাশের পর তার জাত বাঁচানোর এক প্রানান্ত চেষ্টা?

করোনার এ অবরুদ্ধকালে মানুষ অনেকটা নির্জীব জীবন যাপন করলেও প্রকৃতি যেনো ফিরে পেয়েছে নতুন প্রান। বদলে গেছে তার রূপ। কয়েক মাস আগেও ধুলোয় ধুসর ছিলো পৃথিবীর বড় বড় শহর গুলোর আকাশ। মারাত্মক বায়ু দূষণে নাভিশ্বাস উঠেছিল মানুষের। এখন কলকারাখানা ও যানবাহন বন্ধ থাকায় বাতাসে ধূলিকণাসহ বিষাক্ত সব পদার্থের উপস্থিতি কমেছে। স্যাটেলাইট থেকে তোলা ছবিতেও ধরা পড়েছে এই পার্থক্য। চীন একাই ২০ শতাংশ কম গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণ করছে। নিউ ইয়র্কেও কার্বন নিঃসরণ ১৫ শতাংশ কমেছে। স্বচ্ছ হয়েছে ভেনিসের খালগুলো, ফিরে এসেছে মাছ। ইতালির উপকূলে ফিরেছে ডলফিন। তেল আবিব বিমানবন্দরে মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে সাদা বক আর পাতিহাঁস। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কাছে খেলে বেড়াচ্ছে ডলফিন, সৈকতে চরে বেড়াচ্ছে লাল কাঁকড়া। পত্রপত্রিকা, টিভি, ইউটুব তথা ফেসবুকে প্রকৃতি বদলের এসব তথ্য বেশ স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে আজকাল।

করোনা আতংকের এ ভয়াবহ সময়ে প্রকৃতি বদলালেও মানুষের একটা অংশ বদলাচ্ছেনা মোটেও। এ অংশটার চরিত্র অনেকটা কুকুরের লেজের মতো বাঁকা। ওই বাঁকা চরিত্র কখনো সোজা হবার নয়। গজব আজাব যাই আসুকনা কেনো কিছুতেই এরা বদলায়না। সাকিব আল হাসানের মতো লোকেরা এ অংশের সভ্য হয়ে উঠুক, তা আমাদের মোটেও কাম্য নয়।

লিমরিক ২৩ /০৪/২০২০

Facebook Comments Box

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here