নাস্তিক্যবাদের আশীর্বাদ, ডারউনীয় মতবাদ

0
103

নাস্তিক্যদের নাকি উপাসনা করার কেউ নেই, নেই কোন উপাসনার গ্রন্থ। কিন্তু জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের মতবাদের পর ডারউইনই হয়ে যায় নাস্তিক্যদের দেবতা এবং বিবর্তনবাদ তত্ত্ব সম্বলিত বই অরিজিন অব স্পিসিস হয়ে যায় তাদের নাস্তিক্যবাদ গ্রন্থ। 

ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস থেকেই নাস্তিক্যবাদের উৎপত্তি। নাস্তিক সে ই যার কোন ধর্ম নেই, সুতরাং ধর্মের প্রতি মূল্যবোধ, ধর্মকর্ম মানার কোন বাধ্যবাধকতাও তার থাকে না।।

সে তখন থাকে পাপ পুণ্যের ঊর্ধ্বে, যার মনে কোন পাপবোধ নেই, যে কোন ধরনের পাপ কাজ করতে তার বিবেকে বাধে না, কারণ তার বিশ্বাস পাপ বলে কিছু নাই; আবার ভালো কাজ করে পুণ্য অর্জন করবে তার ধার ও সে ধারে না।।

নাস্তিকরা যে ধর্ম কর্ম পালন না করে খুব বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিচ্ছে, ধর্ম যে আসলেই মিথ্যা বানোয়াট একটা বিষয়, তা প্রমান করার জন্য তারা সদা তৎপর থাকে।।

তাদের নাস্তিক্যবাদ তত্ত্বকে সুপ্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে ধর্মগুলোকে নানাভাবে দোষারোপ করে, বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে, বিকৃত করে সমালোচনার তীর দিয়ে জর্জরিত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তেমনি নিজেরদের যুক্তিকে বাস্তব ও সত্য প্রমাণের লক্ষ্যে তাদের পক্ষের ও মতের সব তত্ত্ব উপাত্ত সংগ্রহ করে তার পক্ষে জোর মতবাদ উত্থাপন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

নাস্তিক্যদের কোন যুক্তি, তর্ক, তত্ত্ব উপাত্তই হালে পানি পাচ্ছিল না। খুব শক্তিশালী কোন যুক্তি দাঁড় করাবে ধর্মের বিরুদ্ধে তা খুঁজে পাচ্ছিল না। কিন্তু ডারউইনের মতবাদ তারা আশীর্বাদ আকারে পেয়ে যায়।

অনেকগুলো তত্ত্বের মাঝে চার্লস ডারউনের মতবাদ নাস্তিক্যবাদের একটা দ্বার সুপ্রশস্থ হয়ে যায়। ডারউইন হয়ে যায় তাদের দেবতা, আর বিবর্তনবাদ তত্ত্ব টা হয়ে যায় তাদের নাস্তিক্যবাদ গ্রন্থ।

ডারউইন তার অরিজিন অব স্পিসিস বইতে বিবর্তনবাদ তত্ত্বের বর্ণনা করেন। বিবর্তনবাদ তত্ত্বে বলা হয় মানুষ বানরের বংশধর, বিবর্তনের ফলে বানর ধীরে ধীরে মানুষে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মানুযায়ী মানুষের আবির্ভাব হয় আদিপিতা হযরত আদম (আঃ) থেকে।

ডারউইন নিজেও এর কোন প্রমাণ দিয়ে যেতে পারে নাই, এর পরবর্তী বিজ্ঞানীরাও উল্লেখযোগ্য কোন প্রমাণ এখনো দিতে পারে নাই, পারবে বলেও মনে হয়না। এই তত্ত্বটি কেবলমাত্র ধারণার উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত।

বিজ্ঞানীরা বলেন বিবর্তনবাদ একটি ধীর প্রক্রিয়া। কোন একটি জীবের মধ্যে একটি ক্ষুদ্র পরিবর্তন আসতে লক্ষ লক্ষ বছর লেগে যায়। হযরত আদম (আঃ) এর আগমন প্রায় ৬০০০ বছর আগে। মাত্র ৬০০০ বছর আগে আসা হযরত আদম (আঃ) এর ঠিক আগের ব্যক্তিটি কে ছিল তাই কেউ জানেনা তাহলে লক্ষ লক্ষ বছর পূর্বে বানর যে মানুষের বংশধর ছিল, তা কিভাবে বিজ্ঞানীরা জানল?

হাজার হাজার বছর ধরে পৃথিবী জুড়ে মানুষের বিচরণ, ধরে নিলাম বানরের প্রজাতি এর আগে থেকেই আছে কিন্তু প্রশ্ন হল হাজার হাজার বছর একটা বানর কে কেউ মানুষে রূপ নিতে দেখেছে? অতবা যে বানর প্রজাতি বর্তমানে বিদ্যমান তারাও তো এতদিনে মানুষের রূপ নেয়ার কথা ছিল।

বিবর্তনবাদের নিয়ম হল বিবতনের ধারাটা অব্যাহত থাকবে, বানর থেকে যেমন মানুষ তেমনি মানুষ থেকে গরু, ছাগল না হোক সমজাতির কিছু তো তৈরি হত। কিন্তু তা যে হয়েছে এমন কেউ তো তা চাক্ষুষ দেখে নি।।

তারপর যে বানর গুলা আছে তাদের কেও আজকে গাছে গাছে ঝুলতে হত না, মানুষের জাত ভাই হয়ে একইসাথে বসবাস করত।

তাহলে বিজ্ঞানীদের প্রদানকৃত প্রমাণের কি হবে?

এইটা ঠিক যে বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন তত্ত্ব উপাত্ত হাজির করেছে। বিভিন্ন জীবাশ্ম ফসিল দিয়ে প্রমাণ করানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে মিলিয়ন বছর পূর্বেও মনুষ্য প্রজাতির বিচরণ ছিল।

যারা ইউভাল নোয়াহ হারারির সেপিয়েন্স বইটি পড়েছেন তারা লক্ষ্য করবেন যে সেখানে ‘নিয়ানডার্থাল’ এর কথা বলা হয়েছে। ‘নিয়ানডার্থাল’ কে বলা হচ্ছে মানুষের আদি আকৃতির প্রজাতি যারা হোমো গন বা স্পেসিস এর অন্তর্ভুক্ত। যাদের বৈজ্ঞানিক নাম Homo neanderthalensis। বিজ্ঞানীদের ধরনামতে প্রায় ৬০০ হাজার বছর আগে এদের উৎপত্তি এবং প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে এদের বিলুপ্তি ঘটে। বিধিবাম, এত শ বছর ছিল আর ৩০-৪০ হাজার বছর থাকতে পারল না? তাহলেই তো দেখা যেত, আসলে ‘নিয়ানডার্থাল’ কি আসলেই মানুষ ছিল নাকি বানর শিম্পাঞ্জির মত কিছু।

নিয়ানডার্থালসের নাকি মাথার খুলি টুলি পাওয়া গিয়েছে যা দেখতে মানুষের খুলির মতই। হ্যাঁ হতেই পারে। বানর কিংবা শিম্পাঞ্জির খুলিও তো মানুষের মত, কিন্তু মানুষ তো আর না। বিজ্ঞানীরা আদি মানুষের চিত্র দেখাতে গিয়ে কিছুটা বানরের মিল পেয়েছেন। কিন্তু যেসব চিত্র আমরা দেখি তা কেবল মাত্র ধারনাকৃত চিত্র। আগে না ছিল ফটো তোলার যন্ত্র, না ছিল চিত্রাঙ্কন করার দোয়াত কালি কাগজ। শুধু ধারনা করেই আমাদেরকে বলা হচ্ছে এই যে দেখ তোমাদের পূর্ব পুরুষ দেখতেও বানরের মত ছিল।

হ্যাঁ, অতীতের মানুষের চেহারা আজকের মানুষের মত এত মসৃণ, মোলায়েম, কোমল ও সৌন্দর্যমণ্ডিত ছিলনা। কারণ তখন না ছিল পরিধেয় বস্র, না ছিল পশম চুল কাটার যন্ত্র, না ছিল সাবান শ্যাম্পু লোশন। নখ বড় হয়ে কোদালের মত হয়ে যেত। তাদেরকে বাস করতে হয়েছে গাছের নিছে, কাদামাটি মিশ্রিত স্থান ছিল বিছানার জায়গা। তাইতো তাদের দেখে হয়ত বুনো বা বন্য লাগতে পারে, কিন্তু তারা মানুষ ছিল।

আজকের মানুষ তখনকার মানুষ ছিল বলেই তাদের হুশ ছিল, বুদ্ধি ছিল, ছিল বিবেক। তাইতো তারা ধীরে ধীরে নিজেদের পরিবর্তন ও উন্নয়ন ঘটিয়েছে, তাইতো সেই মানুষ আজকের মানুষ। কিন্তু সে উন্নতি ঘটাতে না পেরেছে মানুষের কথিত সম্প্রদায় বানর, কিংবা অন্য কোন প্রাণী।

মানুষের বিবর্তনকে বোঝানো হচ্ছে এভাবে। একবারে শুরুতে ছিল বানর সাদৃশ্য। মাঝে বুনো মানুষের মত, আর শেষে আজকের মানুষ।

মানুষ মানুষই। মানুষ একমাত্র মানুষ হয়েই জন্মেছে। বানর, শিম্পাঞ্জি কিংবা নিয়ানডার্থালকে আল্লাহ মানুষের কিছু আকার দিয়ে পাঠিয়েছে, কিন্তু তারা মানুষ না। বিড়াল ও বাঘের মধ্যে সাদৃশ্য থাকলেও বিড়াল বিড়ালই আর বাঘ বাঘই। আল্লাহ হয়ত ইচ্ছা করেই এই সাদৃশ্যটুকু রেখেছেন এই সময়ের জন্য। মানুষকে হয়ত আরও গভীরে ভাবার জন্য, হয়ত বিশ্বাস অবিশ্বাসের মাঝখানের থিন লাইনকে বোঝার জন্য।

শেষ কথা

বিজ্ঞান মানুষকে অনেকদূর নিয়ে এসেছে, নিয়ে যাবে আরো অনেকদূর। ডারউইনের কৃতিত্বও অস্বীকার করার জো নেই। প্রত্যেক বিজ্ঞানী তার ধারণা ও গবেষণার প্রেক্ষিতে তত্ত্ব কিংবা সূত্র দিয়ে গেছেন। যার অনেক প্রমাণিত অনেক অপ্রমাণিত কিংবা পরীক্ষাধীন। তাদের অনেক আবিষ্কারের সুফল আজ ভোগ করতেছে মানুষ।

কিন্তু কোন বড় মাপের বিজ্ঞানী তার বিজ্ঞানের সাথে ধর্মকে টেনে আনে নাই। ডারউইন বিবর্তনবাদের তত্ত্বের বর্ণনা দিয়েছেন মাত্র, কিন্তু এইটা বলেন নি যে হযরত আদম (আঃ) মিথ্যা। কিন্তু ডারউইনের সেই তত্ত্বেকে পুঁজি করে নাস্তিক্যবাদী সম্প্রদায় ধর্মকে মিথ্যা বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত। যারা আদতে কোন বিজ্ঞানীও না, অনেকক্ষেত্রে বহুলাংশে শিক্ষিতও না। কিন্তু তাদের মতে তারাই বড় বড় পণ্ডিত ও বিজ্ঞানী। অথচ বহু বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ, বিজ্ঞানী ও উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত রয়েছেন যারা আদম (আঃ) কেই আদি পিতা মানেন।

যারা ধর্মে বিশ্বাসী না, তাদেরকে তো কেউ কিছু বলতেছেনা বা উসকানিও দিচ্ছে না। কিন্তু প্রায়সময় দেখা যাচ্ছে তারাই ধর্মে বিশ্বাসীদেরকে নানাভাবে উসকানি দিয়ে, খোঁচা দিয়ে উত্যক্ত করার নগ্ন খেলায় মত্ত। বাংলাদেশে ৯০ ভাগেরও বেশি মুসলমান এবং তন্মদ্ধে ৯০ ভাগেরও বেশি ধর্মে বিশ্বাসী। কি দরকার এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া।

কেউ ধর্মে বিশ্বাসী কি বিশ্বাসী না তা যার যার ব্যক্তিগত বিষয়। কিন্তু কেন যে একটা গোষ্ঠী কাঠি নেড়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টায় মত্ত। বাংলাদেশে অনেক অমুসলিম আছে, বেশ নাস্তিকও রয়েছে। কিন্তু তারা কি কখনো অনিরাপদ ছিল? মাঝখানে দুই একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু দেখতে হবে কোন সময়ে তা ঘটেছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো ঘটেছেই রাজনৈতিক অস্থির সময়গুলাতে। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের দ্বারা কোন অমুসলিম কিংবা নাস্তিকদের ক্ষতিসাধন কখনোই হয় নাই।

বিজ্ঞানের জয়যাত্রা চলতে থাকুক, কিন্তু ধর্মকে পাশ কাটিয়ে কিংবা পদদলিত করে নয়।

Facebook Comments Box