রাজনীতি এবং ধর্ম : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ

0
443
IBT-Kabir-Ahmed

রাজনীতি এবং ধর্ম : প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ


 

১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ( হিন্দু এবং মুসলমান ) ভিত্তিতে ভারত উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে ভারত এবং পাকিস্তান ( পূর্ব এবং পশ্চিম ) নামে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় । কোন প্রকার সহিংসতা এবং রক্তপাত ছাড়া শুধু ধর্মের ভিত্তিতে দুটি রাষ্ট্রের সৃষ্টি প্রমাণ করে ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় উপমহাদেশর রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব অপরিসীম ।

১৯৪৭ – ৭১ পর্যন্ত পাকিস্তানের ( পূর্ব এবং পশ্চিম ) ইতিহাস আমাদের সকলের জানা । সে ইতিহাস ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের উপর শাসন , দমন , অন্যায় , অত্যাচার , শোষণ এবং নিপীড়নের ইতিহাস । নির্মমতা হলো , যে দেশ ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্টি হলো , সেখানে পশ্চিমাদের কর্তৃক একই ধর্মের পূর্বপাকিস্তানের লোকদের উপর জুলুম নির্যাতনের সময় ধর্মীয় কোন অনুভুতি কাজে আসেনি । যদি কাজে আসতো , তাহলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লক্ষ মানুষের জীবন এবং দুই লক্ষ বীরঙ্গনার সম্ভ্রম হানি হতো না । যে কারণে আমাদের মুক্তি যুদ্ধের অন্যতম মূলনীতি ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ ।

ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মুসলমান অনেক ধর্মপ্ররায়ন । ধর্মের প্রতি আমাদের আবেগ অনুভূতি অনেক প্রখর । এই অনুভূতিকে পুঁজি করে সামরিক এবং স্বৈরতান্ত্রিক সরকার গুলো ধর্ম কে রাজনীতিতে ব্যবহার করা শুরু করেন । এর বড় প্রমাণ হলো ১৯৭২ সালের সংবিধানের মূলনীতির পরিবর্তন । সে ধারাবাহিকতায় যখন যে রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় এসেছেন , মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য ব্যবহার করেছেন । এমন কি বিরোধী দল গুলোও সুযোগ পেলে রাজনৈতিক লাভের আশায় ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগান ।

আমি এ প্রসঙ্গে দুটি ঘটনার অবতারণা করতে চাই , একটি হচ্ছে ২০১৪ সালে ৫ই মে হেফাজতের ডাকে ঢাকা অবরোধ । এ অবরোধটি ছিল মূলত কয়েকজন ব্লগারের ইসলাম বিদ্বেষী কটুক্তির প্রতিবাদে । যে অবরোধে ঢাকাসহ সমগ্র বাংলাদেশ অচল হয়ে গিয়েছিল । আমি এধরনের কটুক্তিকে তীব্র ঘৃণা ভরে প্রতিবাদ করি এবং নিন্দা জানাই ।

দ্বিতীয়টি হচ্ছে সাম্প্রতিক কালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কে আমন্ত্রণের প্রতিবাদে ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং চট্রগ্রামে সহিংসতায় অনেক প্রাণহানি ঘটেছে । যাদের অধিকাংশই যুবক এবং তরুণ । যে জীবন গুলো ছিল এক একটি পরিবারের আশার আলো এবং মা বাবার বুকের ধন । দেশের প্রতিটি নাগরিককে সুরক্ষিত রাখা সরকারের পবিত্র দায়িত্ব । সেখানে এত গুলো তাজা প্রাণ ঝড়ে যাওয়ার দায় সরকার এড়াতে পারে না । আমি মনে করি সরকার এখানে রাজনৈতিক অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন । আমি প্রতিটি বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করি ।

কিন্তু বাংলাদেশে এমন অনেক ঘটনা আছে , যে গুলো উপরে বর্নিত ঘটনার মতোই স্পর্শকাতর ছিল ।উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে ছিল –

২০১৯ সালের এপ্রিলে ফেনীতে মাদ্রাসা শিক্ষক কর্তৃক যৌনলালসার শিকার হয়ে নুসরাত জাহান কে আগুনে পুড়ে হ্ত্যার ঘটনা আমাদের সকলের জানা ।
২০২০ সালের অক্টোবরে নোয়াখালিতে ফেইস বুক লাইভে এসে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও আমরা সবাই দেখেছি । ঠিক একই সময়ে সিলেটের এম সি কলেজে গৃহবধুর গণধর্ষণের ঘটনা আমাদের কাহারও অজানা নয় ।

২০২০ সালের আগষ্টে কক্সবাজারে চকরিয়ায় মা ও তরুনী মেয়ে কে গরু চোর সন্দেহে নির্মমভাবে পিটানো হয় এবং পরে কোমরে রশি বেঁধে প্রকাশ্যে সড়কে হেঁটে নিয়ে যাওয়া হয় স্হানীয় ইউনিয়ন অফিসে । মা এবং মেয়ের কোমরে বাঁধা ছবি প্রতিটি দৈনিকে যখন ছাপা হয়েছিল তা দেখে কি আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়নি ?

উপরোল্লিখিত হৃদয় বিদায়ক ঘটনা গুলো তখন দেশ ব্যাপী আলোড়ন তৈরী করেছিল এবং নিন্দার ঝড় বয়ে গিয়েছিল । যে কোন বিবেচনায় উল্লেখিত ঘটনা গুলো কোন ভাবেই গ্রহনযোগ্য নয় , আইনের দৃষ্টিতে অপরাধ , সামাজিক দৃষ্টিতে খুবই ঘৃনীত এবং ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ বা গুনাহের কাজ । রাষ্টীয় ভাবে বা সামাজিক ভাবে এ ধরণের ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ হলেও , ইসলামিক কোন সংগঠন কোন প্রতিবাদ বা আন্দোলনের ডাক দেন নি । এ গুলোকি ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী ছিল না ?

হঠাৎ এ ধরনের আন্দোলনে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরী করে এবং সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে । যে কারণে সম্মেলিত প্রতিবাদ বা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহন দেখা যায় না । এখানে যে অন্য কোন উদ্দেশ্য থাকতে পারে , সে সন্দেহ কি জনমনে উঁকি দিতে পারে না ? সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে , রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়ার অভিপ্রায় যে ছিল না , তা কি আমরা অস্বীকার করতে পারি ?

আমার বিশ্বাস ইসলামের অনুভূতিতে যে কোন ধরনের আঘাত , যে কোন মুসলমান তার জন্য তীব্র প্রতিবাদ করবে । আমাদের খুব সচেতন ভাবে অনুধাবন করতে হবে , ইসলামের দোহাই দিয়ে যেন কোন পক্ষ সহিংসতা তৈরী করে রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করতে না পারে ।

কবির আহমদ
SUSTIAN
Ashbourne , Ireland
5th April 2021

Facebook Comments Box