কমিউনিটি লাইভ আড্ডায় তিনজন গৃহিনী ও কর্মজীবী নারীর আলাপচারিতা

0
385

আব্দুর রাহিম ভূঁইয়া

আয়ারল্যান্ডের বিশেষ তিনজন গৃহিনী ও কর্মজীবী নারীর অংশগ্রহণে ইউএস ভিত্তিক অনলাইন টিভি “চ্যানেল-১৯” এর উদ্যোগে ১৭ই অক্টবর একটি লাইভ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেছেন ডাঃ সানজিদা আক্তার। আমন্ত্রিত অতিথীবৃন্দরা হচ্ছেন আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী তিনজন আলোকিত নারী। তাঁরা হচ্ছেন ফেরদৌসী বেগম, ইসমত চৌধুরী সীমা এবং লিনা সেন গুপ্তা।

আয়ারল্যান্ড স্টুডিও থেকে বিষয় ভিত্তিক আলাপচারিতা মুলক লাইভ অনুষ্ঠানটি “কমিউনিটি লাইভ আড্ডা” নামে সম্প্রচারিত হয়। অতিথীবৃন্দ নিজেদের পারিবারিক জীবন, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সমস্যা, করোনাকালীন বিভিন্ন সমস্যা, পেশাগত অভিজ্ঞতা দর্শকদের সাথে শেয়ার করেন। এই অনুষ্ঠানটি “আমরা আয়ারল্যান্ড প্রবাসী” নামক ফেইসবুক গ্রূপের আয়োজনে নির্মিত হয়।

ফেরদৌসী বেগম একজন প্রাক্তন ব্যাংক কর্মকর্তা। তিনি বাংলাদেশে একটি ব্যাংকে চাকরি করেছিলেন। এখন তিনি ডাবলিনে স্বপরিবারে বসবাস করেন। তিনি মনে করেন করোনার প্রাথমিক দিকে লকডাউন থাকায় এর প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ছিল এবং লকডাউন শিথিল করায় এর সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পায়। এ সময়ে অনেকে মাস্ক ব্যবহারে উদাসীনতা দেখায়, হঠাৎ করে স্কুল খুলে যাওয়া, দোকানপাটে সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখার কারণে প্রথম লকডাউন পরবর্তী সময়ে এর প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছিল।

https://www.facebook.com/channel19.tv/videos/675275713410331

ফেরদৌসী বেগমের কন্যা চিকিসক হিসেবে আয়ারল্যান্ডে আছেন। কোভিড চলাকালীন সময়ে স্বাস্থ্যসেবা দিতে গিয়ে তাঁর মেয়ের যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হন তা শেয়ার করেন। করোনা থেকে সুরক্ষার জন্য বাসায় করণীয় হিসেবে বাসাকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার ব্যাপারে মতামত জ্ঞাপন করেন। এ সময় তিনি সুষম খাদ্যের উপর নজর দেওয়ার ব্যাপারে জোরালো ভাবে উৎসাহিত করেন। সুস্বাস্থ্যের জন্য শারীরিক কৰ্ষতকে প্রাধান্য দেন।

করোনার এই প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে আমাদের কি করণীয় সে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নিজস্ব উদ্যোগে দুস্থদের মাঝে আমাদের সকলের হাত বাড়িয়ে দেওয়া উচিৎ। সরকারের একার পক্ষে এই সংকট মোকাবেলা অসম্ভব। তিনি নিজেও স্বউদ্যোগে দেশে খাদ্য ও নগদ অর্থ সহযোগিতা করেছেন।

দেশে ধর্ষণ বেড়ে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি জানান দেশে সামাজিক অবক্ষয়, ছেলে ও মেয়েদের মাঝে সামাজিক ও পারিবারিক বৈষম্য, পরিবারে ছেলেকে প্রাধান্য দেওয়া, পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা, সামাজিক বৈষম্য, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয়, আইনের শাসনের অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পর্নোগ্রাফি আসক্তি, রাজনৈতিক ছত্রছায়াই প্রধান। এর প্রতিরোধে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। পরিবারে ছেলেদের বুঝাতে হবে একটি মেয়ে মানে তাঁর মা, বোন, স্ত্রী সবচেয়ে বড়ো কথা সে একজন মানুষ। জরিপে দেখা যায় পর্নোগ্রাফিতে আসক্তি ৭৮% লোকের মধ্যে ধর্ষণের স্পৃহা জাগিয়ে তোলে। পরিবার থেকে নারীদের প্রতি সম্মানের চোখে দেখা, স্কুল থেকে শিক্ষা দিলে সমাজের পরিবর্তন আনা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। শুধুমাত্র সাস্তি দিয়ে একক ভাবে মানুষের মন মানসিকতা, নৈতিককতা তৈরী করা যাবে না। প্রশাসনকে এগিয়ে আসতে হবে, বিচারের সংস্কৃতি চালু করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।

ইসমত চৌধুরী সীমা, আয়ারল্যান্ডে বিগত ২০ বছর যাবৎ বসবাস করে আসছেন। কোভিডে আমাদের জীবনাচারণে কোনো পরিবর্তন
এসেছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, এখন যেন আমরা আরেকটা পৃথিবীতে বাস করছি, ছুটির দিনে এখন আর আগের মতো পরিকল্পনা করা হয়না বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে। আগে যেমন বন্ধুদের নিয়ে বাসায় আয়োজন করা হতো এখন স্বাস্থ্য বিধিনিষেধের কারণে বাসায় কাউকে দাওয়াত দেওয়া যায়না বা কারো বাসায় যাওয়া যায় না।
ইসমত চৌধুরীর স্বামী আয়ারল্যান্ডে একজন সুপরিচিত চিকিৎসক। তিনি শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ। যদিও তাঁকে কোবিভি রোগী দেখতে হয় না তার পরেও মাঝে মাঝে কিছু রোগী এসে পড়ে যাদের কোভিড সিম্পটম থাকে। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে এবং তাঁর পুরো পরিবারকে এর থেকে সুরক্ষার জন্য আলাদা ব্যবস্থাপনা করার প্রয়োজন পড়ে। তিনি বলেন জুনিয়র ছাত্রছাত্রীদের স্কুলে মাস্ক পড়ার বিধান রাখা হয় নি, যার কারণে অভিভাবকবৃন্দকে ভীতিকর পরিস্থিতিতে থাকতে হয়।
কোভিডে ইতিবাচক না নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে প্রশ্নে তিনি বলেন ইতিবাচক পরিবর্তনের চাইতে নেতিবাচক পরিবর্তন বেশি হয়েছে মনে হচ্ছে। আর ইতিবাচক পরিবর্তন গুলোর মধ্যে পরিবারের সাথে সময় বেশি দেওয়া, যানবাহন কম চলায় দূষণ কম হওয়া, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় দ্রব্যমূল্য কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

আয়ারল্যান্ডে জন্মগ্রহণ করা সন্তানদের আমাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত করার জন্য কি করণীয় প্রশ্নে তিনি বলেন সন্তানদেরকে ঘনঘন দেশে নিয়ে যাওয়া উচিৎ। ঈদে দেশে নিয়ে যাওয়া যেতে পারে, এতে দেশের সাথে তাঁদের সম্পর্ক স্থাপিত হবে। পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যাতায়াত করতে হবে। কমিউনিটিতে বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহন করতে হবে।

লিনা সেন গুপ্তা একজন ব্যাংকার যিনি বর্তমানে এআইবি ব্যাংকে কর্মরত আছেন। তিনি বলেন এই করোনা ভাইরাসে কর্মস্থলে জীবন প্রবাহে পরিবর্তন এসেছে। এখন কোম্পানিগুলো ৮০% কাজ বাসা থেকে করছে। কাস্টমার সার্ভিস ইন্ডাস্ট্রি পুরোটা বাড়ি থেকে নিয়ন্ত্রন করা যাচ্ছে। এতে এই সেবার গুণগত মানের দিক থেকে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। বিশেষ করে তাঁর নিজের ব্যাংকের সকল শাখা খোলা আছে এই সময়টা জুড়ে। কেউ চাইলে নিকটবর্তী শাখায় গিয়ে সেবা গ্রহণ করতে পারছেন। তাছাড়া এই কোম্পানিতে ফোনে ও অনলাইনে স্বাভাবিক সেবাগুলো বিদ্যমান।

আয়ারল্যান্ডের অর্থনীতিতে কভিডে পরিবর্তন এসেছে, এ সময় হাজার হাজার লোক চাকরি হারিয়েছে, অনেকে ব্যবসায় ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এই সংকট থেকে উঠে দাঁড়াতে আমাদের কয়েক বছর লাগবে বলে তিনি মনে করেন। এই সংকট উত্তরণে আমরা কিভাবে অবদান রাখতে পারি প্রশ্নে তিনি বলেন, আমাদেরকে লোকাল কেনাকাটা করতে হবে। লকডাউন শেষে দেশের বাহিরে ছুটি কাটাতে না গিয়ে এই দেশেই ছুটি কাটানো উচিত, এতে আমাদের অর্থনীতি লাভবান হবে।

লিনা সেন গুপ্তা একটি নাচের স্কুল চালান। লকডাউনে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য ভার্চুয়াল শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেন। কর্মস্থলে নারী বৈষম্য প্রশ্নে তিনি বলেন, এখানেও এটি আছে কিন্তু তা আমাদের দেশের তুলনায় কম। এখানে বেতন বৈষম্য আছে যা এখন পরিবর্তন হচ্ছে ধীরেধীরে। নারীকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে তিনি কিছু কাজ করছেন নৃত্য নাটিকার মাধ্যমে। তিনি ক্লাসিকাল নৃত্য কে ধরে রাখতে চান যা বর্তমানে আধুনিক নৃত্যের মাঝে হারিয়ে যেতে বসেছে।

আমরা “আইরিশ বাংলা টাইমস” পরিবারের পক্ষথেকে চ্যানেল-১৯ এর সকল কলা কৌশলীকে এবং আমন্ত্রিত অতিথিবৃন্দকে স্বাগত জানাই।

Facebook Comments Box