ঈদের নামাজ ও মহামারীর সরকার – হামিদুল নাসির

0
240
Hamidul Nasir - Irish Bangla Times Archives
Hamidul Nasir - Irish Bangla Times Archives
Hamidul Nasir - Irish Bangla Times Archives
Hamidul Nasir – Irish Bangla Times Archives

করোনার মহামারী নিরবিচ্ছিন্ন আক্রমনে তছনছ হয়ে যাচ্ছে পৃথিবী। এমন কোন দেশ বা জাতী নেই যা আক্রান্ত হয়নি। মানব সভ্যতার ইতিহাসে হয়তো করোনাই একমাত্র রোগ বা শক্তি যা এক সাথে ধনী গরিব সকল প্রকার দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

প্রতিটি দেশের সরকার তাদের নিজ নিজ দেশের জনগনকে করোনা থেকে মুক্ত রাখা এবং সেই সাথে স্বাভাবিক জীবন ধারনের জন্য অর্থ সহ সকল যোগান দেওয়ার আপ্রান চেষ্টা করে যাচ্ছে।

আমাদের আইরিশ সরকারও লকডাউনের ফলে কাজ চলে যাওয়া প্রত্যেক নাগরিকের জন্য কভিড-১৯ ফান্ড তৈরি করে ব্যাংক একাঊন্টে ইউরো দিয়ে ঘরের বাহিরে না যেতে অনেক নিয়ম কানুন প্রণয়ন করেছে। ঔষধ সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় গ্রোসারি ও ফ্রন্ট লাইনের কর্মজীবী ছাড়া সবাইকে ‘স্টে হোম সেইভ লাইফ’ স্লোগান দিয়ে আমাদের নিরুৎসাহিত করছে যেন অযথা বাহির না হই।

আল হামদুলিল্লাহ। সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে ডাবলিন সহ আয়ারল্যান্ড প্রতিটি শহরে মসজিদ গড়ে উঠেছে এবং জামাতে নামাজ আদায় হচ্ছে। ভিবিন্ন সময় প্লানিং পার্মিশন নিয়ে মতানৈক্য তৈরী হলেও আইরিশ সরকার এবং জনগনের পক্ষথেকে বিরুপ মন্তব্য বা এক্সট্রিম মতবাদ তৈরী হয়নি। আয়ারল্যান্ড সব সময় সবার জন্য সমান অধিকার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে কাজ করে।

আল্লাহ রাব্বুল ইজ্জত বড়ই মহান এবং বড়ই দয়ালু, তিনি দয়া পরবশ হয়ে এই পৃথিবীতে তার পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্বশীল দায়িত্ব ও কর্তব্য নিষ্পন্ন করার জন্য ‘খলিফা’ বা প্রতিনিধি নিয়োগ করার ব্যাবস্থা জারি রেখেছেন। এ সম্পর্কে আল কুরআনে ইরশাদ হয়েছে ” এবং স্বরন করুন, ওই সময়ের কথা, যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বলেছিলেন, আমি পৃথিবীতে খলিফা বা প্রতিনিধি অবশ্যই সৃষ্টি করব”
( সুরা বাকারা, আয়াত- ৩০.)

হয়তোবা কুরআনের আয়াতের উপর ভিত্তি করেই আয়ারল্যান্ডে ২০০৬ সালে গড়ে উঠেছে ‘ দ্যা আইরিশ কাউন্সিল অব ঈমাম’ নামের একটি সংগঠন। যার মেম্বার সংখ্যা প্রায় ৩৫ জন.
এই সংগঠনই মুলত আমাদের আয়ারল্যান্ড মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব করে। আমাদের অত্যান্ত সুপরিচিত ক্লন্সকি(ICCCI) মসজিদের সম্মানিত ঈমাম আল্লামা হোসেইন হালাওয়া সাহেব এখন চেয়ারম্যান এর দায়িত্ব পালন করছেন।

শরীয়তের সীমারেখায় থেকে সুন্দর আচরণের মাধ্যমে যেমন অমুসলিমদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেয়ার ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়, তেমনি এ আচরণ টুকুও অনেক সময় দাওয়াতের ভূমিকা পালন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন মহানুভব আচরণে মুগ্ধ হয়েও তো অনেকেই ইসলাম কবুল করেছেন এবং পরবর্তীতেও সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে শুরু করে যারাই ইসলামের সুন্দর আচারগুলো নিজেদের মাঝে লালন করে গেছেন, তাদের আচরণই নীরবে অমুসলমানদেরকে ইসলামের দিকে আহবান জানিয়েছে। অনেক অমুসলিম এতে যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছে এবং আশ্রয় নিয়েছে ইসলামের শীতল ছায়ায়।

আমরা নিজেদেরকে মুসলমান দাবী করে থাকি, অথচ যখনই ইসলামী আইন-কানুন বাস্তবায়নের কথা আসে তখনই আমাদের মত ও পথ ভিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। এর কারণ হিসাবে আমি বেশ কয়েকটি দিক চিহ্নিত করতে পারি।

১. ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কি তা না জানা।

২. ইসলামী আইন বাস্তবায়নের হুকুম কি তা জানা সত্ত্বেও কতিপয় সন্দেহ আমাদের মনে দানা বেঁধে থাকে; যা বাস্তবায়নের পথে বাধা

অত্যান্ত পরিতাপের বিষয়। আমরা কিছু সংখ্যক মুসলমান আইরিশ সরকারের কভিড-১৯ নিতীমালা উপেক্ষা করে। আমাদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনের প্রেস রিলিজকে অবজ্ঞা করে জামাতে নামাজ আদায় করেছি এবং আইরিশ সরকার ও জনগনের নজরে এসেছি। যেখানে বিশ্বের সকল আলেম ওলামা বিজ্ঞ ইসলামিক চিন্তাবিদ ঘরে নামাজ পড়ার উপর জোরদার বক্তব্য দিয়েছে।
আমরা কেন? মাঠে, পার্কে এমন কি কার পার্কেও বিনা অনুমতিতে জামাত আদায় করেছি। আমাদের এই খামখেয়ালীপনা বক ধার্মিকতা অতিউৎসাহীপনাকে মিডিয়া ও সরকার ভাল ভাবে নেয়নি। অনেক জায়গায় মসজিদ বন্ধ থাকার পরেও পিছনের দরজা দিয়ে ডুকে জামাত আদায় করার অপরাধে পুলিশ এসে বন্ধ করেছে। যা আমাদের মুসলিম সমাজের জন্য খারাপ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
আমরা যখন আইরিশ নাগরিকত্ব নেই তখনও আমরা দেশের আইন কানুন মেনে চলার ওয়াদা করেছি।

যেখানে আমাদের অত্যান্ত মুল্যবান ফরজ জুমার নামাজ আদায় করতে পারছিনা, এমনকি হজ্জের মত বড় একটি ফরজের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে সেখানে কেন ঈদের ওয়াজিব নামাজকে দেশের মহামারিতে আইন অমান্য করে, নিজের মুসলিম প্রতিনিধির কথা অমান্য করে, আমাদের রাস্টকে দেওয়া ওয়াদাকে নুন্যতম সম্মান না করে জামাত আদায় করতেই হবে?
আমরা যদি অমুসলিম দেশে আমাদের আচার আচরন দিয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সৃংস্কৃতি তুলে ধরতে না পারি তাহলে আমাদের সন্তানদেরকেই তার মুল্য দিতে হবে।

ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলা হয়েছে। শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখা আমাদের দায়িত্বশীল কর্তব্য। ইসলামে আবেগের স্থান নাই। নিজের যা ইচ্ছা করা, অতিরিক্ত করাকেও ইসলাম সমর্থন করে না। আল কুরআন ও হাদিসে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার বদিধান দেওয়া হয়েছে। করোনা থেকে শুরু করে কেয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে সব কিছুর সমাধান দেওয়া আছে।

পরিশেষে আসুন আমরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করি। রাষ্ট্রের আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হলে আমাদের মুসলিম প্রতিনিধিদের পরামর্শ নিয়ে অমুসলিম দেশে আল কুরআন ও হাদিসের আলোকে আমাদের ইসলামিক জীবন ব্যবস্থাকে আলোকিত করি। অন্যান্য জাতী গোষ্ঠী ও ধর্মের মানুষের কাছে সুমহান ও মর্যাদাশালী ধর্মে নিজের ন্যায়নিষ্ঠ ব্যাবহার দিয়ে তৈরি করি আমাদের ভিত্তি। করোনার মহামারী মোকাবেলায় হই সক্ষম। ফিরে পাই আমাদের স্বভাবিক জীবন।

লেখক।
হামিদুল নাসির
ডাবলিন

Facebook Comments Box