ABAI এর শপথ গ্রহণের এক বছর – সফলতা ও ব্যার্থতার খতিয়ান

আবাই এর সফলতা ও ব্যার্থতার এক বছর

0
272

আজ ১৮ ই অক্টোবর, গত বছরের এই দিনে অল বাংলাদেশি এসোসিয়েশন অফ আয়ারল্যান্ড (ABAI) এর ২য় কার্য নির্বাহী পরিষদ শপথ গ্রহণ করে, তার এক বছর পূর্ণ হল। গত ২০২২ সালের ১১ই সেপ্টেম্বর একটি সফল নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয় আবাই এর নতুন কমিটি। ২৬ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির টানা ২য় বারের মত সভাপতি নির্বাচিত হন জনাব ডাঃ জিন্নুরাইন জায়গীরদার।

বিগত এক বছরের সফলতা ও ব্যর্থতার হিসেবের খেরোখাতা নিয়ে বসার সময় এসেছে। তিন বছর মেয়াদি নির্বাচিত কমিটির জন্য এক বছর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাকি দুই বছরের শেষার্ধ চলে যাবে পরবর্তী নির্বাচন প্রদান ও ক্ষমতা হস্তান্তরের ব্যাস্ততা নিয়ে। সুতরাং নির্বাচনের এক বছর পর আবাইকে জবাবদিহির কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য খুব স্বল্প সময় বলে মনে হয় না।

১৮ই অক্টোবর ২০২২ – শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাউন্সিলর আজাদ তালুকদার

নির্বাচনের আগে আবাই এর সদস্যগণ বহু প্রতিশ্রুতির ফুলঝরি ছড়িয়েছেন। নির্বাচনের পরে তার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন নেতাগণ?

আবাই হচ্ছে আয়ারল্যান্ডের একমাত্র কেন্দ্রীয় সংঘটন এবং এই সংঘটনের কমিটি জনগণের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত। সুতরাং আবাই এর প্রতি মানুষের প্রত্যাশা একটু বেশিই। আবাই এর নির্বাচনে যারা অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁরা নিশ্চয়ই নিজেদের যোগ্য মনে করেই করেছেন এবং কমিউনিটিকে নিজের মেধা, শ্রম, সময়, অর্থ উৎসর্গ করার প্রত্যয়েই কমিউনিটির নেতা হতে এসেছেন এবং যারা নির্বাচিত হয়েছেন জনগণ তাদের উপর আস্থা এবং বিশ্বাস রেখেই নির্বাচিত তাদেরকে নির্বাচিত করেছেন। সুতরাং দায়িত্বের জায়গাকে কখনো ছোট করে দেখার অবকাশ নেই।

আবাই এর সদস্য সংখ্যা ২৬ এবং প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা পদ। প্রত্যেক পদের রয়েছে পদ সম্পর্কিত দায়িত্ব। ২৬ জন সদস্য যে যার দায়িত্ব যদি সঠিকভাবে পালন করে, তাহলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সবাই কি যার যার পদ অনুযায়ী দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতেছে?

হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আবাই এর বর্তমান কমিটি বেশ কিছু সফল অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারির মত দিবসে আবাই এর কার্যক্রম ও অনুষ্ঠান আয়োজন ছিল প্রশংশা পাবার দাবিদার। ২১শে ফেব্রুয়ারী ২০২৩ তে লিমেরিকে বিশাল র‍্যালির আয়োজন করে তাক লাগিয়েছিল।

১০ই সেপ্টেম্বর আবাই আয়োজন করেছে বৃহৎ পরিসরে ঝাঁকালো অভিষেক অনুষ্ঠান। গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গ এবং সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে, স্বনামধন্য শিল্পীদের উপস্থিতিতে এমন জমকালো অনুষ্ঠান আয়ারল্যান্ডে আয়োজন করে আবাই সত্যিই চমক দেখিয়েছে। যার জন্য আবাই সাধুবাদ পাবার যোগ্য।

অভিষেক অনুষ্ঠানে আবাই উপদেষ্টা কমিটি গঠন করতেও সমর্থ হয়। যা বিগত টার্মে অনেক বিলম্বে গঠিত হয়েছিল। এদিক দিয়ে বর্তমান কমিটি সফলই বলা চলে।

অভিষেক অনুষ্ঠানের একাংশ

তাই বলে কি শুধু উৎসব আয়োজনই আবাই এর কাজ? না অবশ্যই না, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদি তুলে ধরতে ও মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি সৌহার্দ্যপূর্ণ মনোভাব তৈরি করতে উৎসব আয়োজন, মিলনমেলার জুড়ি নেই এবং প্রয়োজনও রয়েছে। কিন্তু এটাই কেন্দ্রীয় একটি সংগঠনের মূল কাজ শুধু উৎসব আয়োজনই হতে পারে না।

উৎসব আয়োজনের বাহিরে আবাই যে বৃহৎ কাজটি করেছিল এবং যা ছিল সবার আকাঙ্ক্ষা এবং চাওয়া, তা হচ্ছে গত ২৬ শে এপ্রিল ২০২৩ তে আয়ারল্যান্ডের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এর মিনিস্টার জনাব জেমস ব্রাউন এবং চিপ ইমিগ্রেশন অফিসার জনাব কণর মারফি এর এর সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফলফ্রসু মিটিং করেন।

বাংলাদেশে আইরিশ দূতাবাস স্থাপন অথবা দূতাবাসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে কন্স্যুলার অফিস অথবা এজেন্ট স্থাপন, ভিসা বিষয়ক জটিলতা দূরীকরণ, এম্বেসির বিকল্প হিসেবে VFS এর মত ইমিগ্রেশন এজেন্ট স্থাপন করা ও ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রাম চালু করার জন্য জোরালো অনুরোধ জানান। এছাড়াও বাংলাদেশ থেকে ওয়ার্ক ভিসা, স্টুডেন্ট ভিসার কোটা বর্ধনের জন্য অনুরোধ ও ভিসা প্রদানের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন অফিসারদের অবহেলার কথাও বর্ণনা করা হয়।

এছাড়াও ইমিগ্রান্টদের বাবা মায়ের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা, অনথিভুক্তদের বৈধতা পাবার প্রক্রিয়া তরান্বিত করা এবং ইমিগ্রেশন সার্ভিস অনলাইনকরণের ব্যপারেও জোর দেয়া হয় উক্ত মিটিংয়ে।

উত্থাপিত সব বিষয়ই যৌক্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ, এজন্য আবাই অবশ্যই বাহবা পেতেই পারে। উক্ত মিটিংয়ের পর আবাই কি তার কোন ফলো আপ করছে কিনা, বা মিটিংয়ের পর কোন আপডেট আছে কিনা, তা আবাই এর পক্ষ থেকে এমন কোন তথ্য পাওয়া যায়নি।

আবাই এর গঠনতন্ত্রে পাসপোর্ট সার্জারিসহ অন্যান্য কূটনৈতিক বিষয়ে হাই কমিশনের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখার কথা বর্ণিত আছে। কিন্তু এ বিষয়ে আবাই এখন পর্যন্ত অক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। আয়ারল্যান্ডে কনস্যুলার সার্ভিস এখনো একটি স্থায়ী প্ল্যাটফর্মে দাড়াতে পারেনি, এবং সে লক্ষ্যে কোন কার্যক্রমও চোখে পড়তেছেনা। একটি কেন্দ্রীয় সংঘটন হিসেবে আবাই এ বিষয়ের সুরাহা এখনো করতে পারেনি। যা আয়ারল্যান্ডে বসবাসরতদের দীর্ঘদিনের দাবি।

আবাই এর নির্বাচিত বেশ কিছু সদস্য খুবই একটিভ সামাজিক কার্যক্রমে। কমিউনিটির যে কোন কাজে কর্মে, উৎসবে আয়োজনে, সাহায্য সহযোগিতায়, সবার সুখে দুঃখে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। আয়ারল্যান্ডের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়াতে দেখি তাদেরকে। তাদের এই আত্মত্যাগ অবশ্যই মানুষ মনে রাখবে।

কিন্তু কয়েকজনকে একটিভ থাকতে দেখা গেলেও আবাই এর বেশিরভাগ সদস্যকেই নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। তাঁদের নির্লিপ্ততা দেখে মনেই হয়না যে তাঁরা কোন একটা দায়িত্ব বহন করে চলতেছেন এবং মানুষ তাঁদেরকে ভোট দিয়েছেন অনেক আশা ও আস্থা রেখে। কিন্তু মানুষের সেই আস্থার জায়গা তাঁরা কতটুকু পূর্ণ করতে পেরেছেন তা কেবলমাত্র তাঁরাই জানেন।

এরপর অনেক সদস্য আছেন যিনি নিজেই জানেন না তার পদের কাজ কি, যে পদের জন্য উনি দাঁড়িয়েছেন সে পদের উপযুক্ত কাজ যে উনাকে করতে হবে সে বিষয়ে তিনি মোটেও ওয়াকিবহাল নন। উদ্দেশ্যবিহীনভাবে শুধু একটি পদ দখল করে রাখার প্রত্যয়ে আর নেতা হবার খায়েশে যোগ্যদের বঞ্চিত রেখে একটি পদ আঁকড়ে পড়ে আছেন। অথচ ঐ পদে যদি একজন যোগ্য ব্যক্তি আসতেন তাহলে সে পদটি অলংকৃত হয়ে থাকত। ধীর্ঘ তিন বছর একটি পদের সেবা থেকে কমিউনিটি বঞ্চিত হয়েই থাকবে।

আবাই হচ্ছে কমিউনিটির সবার জন্য একটি কমিটি। এখানে সবার চাওয়াকে সমানভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে আঞ্চলিকতা, রাজনৈতিক মতপার্থক্য, পেশা, শ্রেণি, ধর্ম ইত্যাদি ভেদাভেদ করে চলা সমীচীন নয়। অথচ অনেক ক্ষেত্রে এসবের সামঞ্জস্যতা বজায় রাখতে আবাই ব্যার্থ হয়েছে। এখানে বাংলাদেশি মুসলিম আছে, হিন্দু আছে, বৌদ্ধ এবং খ্রিস্টান ধর্মালম্বী মানুষও রয়েছে। আবাই কি সবাইকে সমান চোখে দেখতে সক্ষম হচ্ছে অথবা সবার চাওয়াকে সমানভাবে পূরণ করতে সমর্থ হচ্ছে? আবাই এর গঠনতন্ত্রে বলা আছে আবাই সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মাহফিল, পূজা ইত্যাদি আয়োজনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে কিংবা উদ্যোগ গ্রহণকারীকে সার্বিক সহযোগীতা করবে। আবাই তা আধৌ কি পালন করতেছে বা করার চেষ্টা করতেছে?

আবাই একটি নির্বাচন কমিশনারদের ভোটার রেজিস্ট্রেশনের জন্য করা ওয়েবসাইটটিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবহার উপযোগী করা এবং ভোটার লিস্ট এর ডাটাবেজের কাজ চালিয়ে যাবার প্রতিশ্রুতি জানান। আজকে এক বছর পরেও সে কাজের কোন অগ্রগতি নেই। চলমান ভোটারদের ডাটাবেজ চলমান থাকার বদলৌতে এক বছর বন্ধই রয়েছে। মনে রাখতে হবে এই ডাটাবেজ কিন্তু শুধু নির্বাচনের জন্যই না, আয়ারল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষের একটি পূর্নাঙ্গ ডাটাবেজ যা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার ও কমিউনিটির জনসংখ্যা হিসেবের একটি সহজ মাধ্যমও বটে। এবং আশা করব বানান ভুলে ভরা ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গঠনতন্ত্রের বানান শুধরিয়ে নিবে।

আবাই এর একটি পূর্নাঙ্গ তথ্যবহুল ওয়েবসাইট এখনো তৈরি করা হয়নি। বিগত এক বছরে এর কোন অগ্রগতিও লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। লোগো নিয়ে বিভ্রাট দীর্ঘদিনের। একটি অফিসিয়াল লোগো এখন পর্যন্ত আবাই তৈরি করতে ব্যার্থতার পরিচয় দিয়েছে। অথচ এসব কর্মাদি পরিচালনার জন্য দায়িত্বরত সদস্য রয়েছেন।

নির্বাচনের পরে আবাই এর একটি স্থায়ী কার্যালয় স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অনেকেই। কিন্তু অদ্যাবধি স্থায়ী কার্যালয় স্থাপন তো দূরের কথা, এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য কমিটির কারো কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছেনা।

আবাই এর বর্তমান সভাপতি নির্বাচনের আগে গঠনতন্ত্রকেই তাঁর নির্বাচনী ইশতিহার হিসেবে গণ্য করেছিলেন। উপরে বর্ণিত দুই একটি উদাহরণ ছাড়াও গঠনতন্ত্র এর অনেক বিষয়ই অধরাই রয়ে গিয়েছে। সাধারণ সম্পাদক ও অন্যান্য সদস্যগণ নির্বাচনের আগে ইশতিহার ও অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তার কিছু সম্পন্ন হলেও বহুলাংশই অসম্পন্ন রয়ে গিয়েছে এখন পর্যন্ত।

শেষ কথাঃ

হ্যাঁ এটা সর্বাগ্রে সঠিক যে, আবাই একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। এখানে আগত নেতা নেত্রীদের কেউই এখানে পেশাদার না। সবারই নিজস্ব আলাদা পেশা রয়েছে, পরিবার পরিজন রয়েছে। কমিউনিটির সেবা দিতে অবশ্যই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাশাপাশি কমিউনিটির অন্যদের কাছে আশানুরূপ সহযোগিতাও অনেকসময় পাওয়া যায় না। এর মাঝেই আত্মবিসর্জন করে কাজ করতে হচ্ছে।

তারপরেও বিষয় হচ্ছে সব কিছু বিবেচনা করেই সদস্যগণ নির্বাচনে লড়েছেন, কমিউনিটি সেবার শপথ নিয়েছেন। কেন নিয়েছেন? নিজের কিছু মেধা, শ্রম, সময়, অর্থ স্যাক্রিফাইস বা বিসর্জন করবেন বলেই তো এ পথে এসেছেন? কেউ হয়ত কম কেউ বেশি। যার যার নিজস্ব যোগ্যতা অনুযায়ী সে সে কাজ করবেন। নির্বাচনের আগে অথবা কমিটিতে নাম লেখানোর আগে সবাইই ঘোষণা দিয়েছেন যে আমিই এ পদের জন্য যোগ্য। তাহলে সে যোগ্যতার সাক্ষর রাখতে সমস্যা কোথায়? দায়িত্বের জায়গা থেকে যদি আবাই এর সদস্যগণ দায়িত্ব পালন না করে থাকে তাহলে একজন কমিটির বাহিরের সাধারণ ব্যক্তি থেকে আপনার পার্থক্য কোথায়? তাহলে তো আয়ারল্যান্ডের কমিউনিটির সবাইকে একটা একটা কাগুজে পদ উপহার হিসেবে দিয়ে দেয়া যায়।

এখনো দুই বছর সময় আছে। যারা দায়িত্বে আছেন আশা করব তারা দায়িত্বের সদ্ব্যবহার করবেন। আগামী নির্বাচনে আপনারা হয়ত নির্বাচনে নাও আসতে পারেন অথবা আসলেও জয়ী নাও হতে পারেন। সুতরাং আপনাদের সামনে এখনো সুযোগ অপেক্ষা করতেছে, যে ব্রত কমিউনিটির সেবা করতে এসেছেন, তা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যান। কমিউনিটি আপনাদেরকে মনে রাখবে। মনে রাখবে আপনার কর্মের জন্য, পদের জন্য নয়।

ওমর এফ নিউটন
বার্তা সম্পাদক
আইরিশ বাংলা টাইমস

Facebook Comments Box