হাসপাতালে ঘুরেও সহায়তা না পেয়ে অতিরিক্ত সচিবের মৃত্যু

0
300

অবশেষে যথেষ্ট মেডিকেল সহায়তার অভাবে কিডনির জটিলতায় অসুস্থ হয়ে মারা যান খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গৌতম আইচ সরকার । তার মেয়ে ডা. সুস্মিতা আইচ এর অভিযোগ একের পর এক হাসপাতাল ঘুরেও কোনো সহায়তা পাননি ।আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমি ডাক্তার হয়েও কিছু করতে পারলাম না।’

গত বৃহস্পতিবার কোভিড-১৯ রোগীদের জন্য নির্দিষ্ট কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এই সরকারি কর্মকর্তাকে। সেখানেই গত শনিবার সকালে তিনি জ্বর, অ্যাজমা ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুবরণ করেন ।

যে ৩৩৩ হটলাইন নম্বর থেকে সরকার স্বাস্থ্য সেবা দিচ্ছে, সেখানে দায়িত্বরত আছেন গৌতম আইচের মেয়ে ডা. সুম্মিতা।

ডাঃ সুস্মিতা বলেন , ‘কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ না থাকলেও অন্য কোনো উপায় না পেয়ে অনেক কষ্টে বাবাকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করাই। বাবার আইসিইউ সাপোর্টটা খুব দরকার ছিল, কিন্তু তা পাওয়া যায়নি। বাবার চিকিৎসাই হলো না, তিনি মারা গেলেন।’

তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও তার বাবা কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত কি না, তা জানার চেষ্টাও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ করেনি।

গত বৃহস্পতিবার ল্যাবএইড হাসপাতালে অতিরিক্ত সচিব গৌতমের ডায়ালাইসিসের সময় প্রেসার বাড়ার পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট শুরু হলে ল্যাবএইডের ইমার্জেন্সি থেকে চিকিৎসক মেয়ে সুস্মিতাকে ফোন করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি বাবাকে ল্যাবএইডে ভর্তি করাতে বলি। কিন্তু তারা বলে, তাদের কনসালটেন্ট নেই, ভর্তি রাখতে পারবে না। তারা জানায়, ল্যাবএইডে তারা আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না। তাই প্রেসার কমানোর ওষুধ দিয়ে বাসায় নিয়ে যেতে বলে। ল্যাবএইডে তিনি নিয়মিত যে ডাক্তারকে দেখান তিনিও সেদিন ছুটিতে ছিলেন।

‘আমার কাছে মনে হয়েছে বাসায় আনা ঠিক হবে না, এই মুহূর্তে অক্সিজেন দরকার। বিকেল ৪টায় ডায়ালাইসিস শেষ হয়, আমরা বাবাকে নিয়ে বিকেল ৫টার দিকে ইউনাইটেড হাসপাতালে যাই। তাদের কথা, শ্বাসকষ্ট যেহেতু হচ্ছে, কোভিড-১৯ কি না?

‘তার কোনো জ্বর ছিল না। আমি নিজে ডাক্তার পরিচয় নিয়ে সব কিছু বুঝিয়ে বললাম। তখন তারা বলল, কোনো রেফারেন্স ছাড়া তারা ভর্তি নিতে পারবে না। সেখানে আমরা কোভিড-১৯ টেস্ট করাতে চাইলে তারা আইইডিসিআর-এর কথা বলে। কিন্তু তারা (আইইডিসিআর) তো টেস্ট করানো বন্ধ করে দিয়েছে।’

পরে গৌতমকে নিয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান তার মেয়ে। সুস্মিতা বলেন, ‘তারাও টেস্ট করানোর কথা বলে স্কয়ারে নেওয়ার পরামর্শ দেন। সেখান থেকে আনোয়ার খান মর্ডান হাসপাতালে নিয়ে আসি, কিন্তু তারা পেশেন্টকে দেখেইনি, চেকও করেনি। তারা বলে, ভর্তি নিতে পারবে না। যেহেতু আমি এই হাসপাতালে কাজ করেছি, আমি অতিরিক্ত পরিচালকের সঙ্গে কথা বলি। তিনি চেস্ট এক্সরে করিয়ে আনতে বলেন। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছিল বাবা স্ট্রোক করেছে। কারণ তার কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর তিনি কোভিড-১৯ টেস্ট করানোর কথা বলেন। ওখানে আইসিইউ সাপোর্ট দিতে পারবে না বলে জানানোয় স্কয়ারে নিয়ে যাই।

‘স্কয়ার বলে, আমাদের পক্ষে ভর্তি নেওয়া সম্ভব নয়, আমরা টেস্ট বন্ধ করে দিয়েছি। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে যাই। তারা বলে, এই পেশেন্টকে কার্ডিয়াক সাপোর্ট দেওয়া দরকার, যেহেতু কিডনির পেশেন্ট । আমরা পারব না ,আমাদের এই সাপোর্ট শুরু হয়নি। এরপর সেখান থেকে সোহরাওয়ার্দী কার্ডিয়াকে যাই। তারা রাখতে পারবে না বলে জানায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে কথা বলি, তারাও বলে, এই মুহূর্তে ভর্তি নেওয়া সম্ভব না। আমি মিরপুরের রিজেন্ট হাসপাতালেও গিয়েছি।’

সুস্মিতা বলেন , ‘আমাদের আশপাশে এমন কোনো হাসাপাতাল নেই যেখানে ভর্তি করানোর চেষ্টা করিনি। পরে সাড়ে ৯টার পর যখন আর কিছু করার ছিল না তখন আমরা বাসায় এসে বসে থাকি। কারণ আমাদের আর কিছুই করার ছিল না।’

তিনি আরো বলেন ‘আমার কাছে অদ্ভুত লেগেছে একজন ডাক্তার হিসেবে আমি জানতাম বাবার কী হয়েছে, কিন্তু আমি কোথাও তাকে আইসিইউ সাপোর্টে নিতে পারলাম না। তার একটা আইসিইউ সাপোর্ট হলেই হতো, আমি তার হিস্ট্রিটা খুব ভালোমতোই জানি। বাবার সমস্যা মাঝে মাঝে খুব জটিল হয়, তার আইসিইউ সাপোর্ট দরকার হয়।’

সব হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি করাতে না পেরে বাবাকে নিয়ে যখন বাসায় বসে আছেন, তখন তাদের এক আত্মীয় অনেক চেষ্টার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে একটা ‘সিট ম্যানেজ’ হয়েছে বলে জানান ।

সুস্মিতা বলেন, ‘রাত ১০টার দিকে আমাদের একজন রিলেটিভ একটা রেফারেন্সে কুর্মিটোলায় একটা জেনারেল বেডের অ্যারেঞ্জ করেন। বাবার অক্সিজেনের খুব বেশি দরকার হওয়ায় তার কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ না থাকলেও তাকে ওই হাসপাতালে নিযে যাই । আলাদা কেবিনে রাখা হয় বাবাকে । শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে বাবার অক্সিজেন ফল করতে শুরু করল । কোনো সরকারি ডাক্তার এ যায়নি। তারা আমাকে ওষুধ বুঝিয়ে দেয়, আমিই ওষুধ খাওয়াচ্ছি, আমার ভাই অক্সিজেন দিচ্ছে।’

সুস্মিতা বলেন, , শুক্রবার সকালে কোভিড-১৯ পরীক্ষা করাবেন বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আমরাও সেটাই চাইছিলাম। কোভিড-১৯ এর রিপোর্টটা পেলে সেই অনুযায়ী আমরা অন্য ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, প্রয়োজনে ভালো কোনো বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতাম। কিন্তু শুক্রবার সারা দিনেও তারা টেস্ট করায়নি। বাবা মারা যাওয়ার পর তারা বলছে, আগেই নমুনা নেওয়া দরকার ছিল। আমরা বললাম, এখন নিয়ে নেন। আমরা এখনো করাতে চাই।

‘আমি ডাক্তার হিসেবে মনে করি, বাবার কোভিড-১৯ এর কোনো উপসর্গ ছিল না। ডায়ালাইসিসের সময় তার আগেও এমন হয়েছে। এই অবস্থায় হাসপাতালগুলো চাইলেই তাকে ভর্তি নিতে পারত। কোভিড-১৯ সন্দেহ হলে প্রয়োজনে আইসোলেশনে রাখতে পারত, কিন্তু কেউ সেটা করেনি,’ বলেন সুস্মিতা আইচ সরকার ।

Facebook Comments Box