স্মৃতিচারণে একাত্তর

0
339

ঘটনা : ১১ ডিসেম্বব ১৯৭১ -১৬ ডিসেম্বর ৭১.

আমরা আমাদের পুরো পরিবার এবং সেন্টারের কিছু মানুষ একই সঙ্গে ঢাকা ছাড়ার ঘটনা.

ব্ল্যাক আউটের রাত্রি. চারিদিকে নিবিড় অন্ধকার, সীমাহীন নিস্তব্দতা. মুহু মুহু সাইরেনের আওয়াজ, বিমান বিধ্বংসী কামানের ভয়ন্কর গর্জন. হটাৎ করে যেন জলে ওঠে আগুন,
ঘরের মধ্যে আমরা সবাই জমাটবাঁধা বেদনার অনুভূতিতে বিষন্ন , ম্রিয়মান.
মায়ের ভীত কণ্ঠ , বাবার অস্থির পায়চারি . পারা প্রতিবেশীর সবার মুখে নীরব জিজ্ঞাসার চিহ্ন. “আমরা সবাই
বাচঁবোতো “?
এই ভয়ার্ত প্রাণহীন চঞ্চলতার মধ্যে আমাদের দিনগুলি কিভাবে কেটেছিলো তা কোনোদিন আমি ভুলতে পারবোনা. চিরদিনই আমার জীবনে স্মরণীয় হয়ে থাকবে.

অনেক দ্বিধা দ্বন্দ্বের পর ১১ ডিসেম্বর ৭১ বেলা ১১ টা র সময়ে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম. আমাদের প্রত্যেকের কাছে হাত ব্যাগ তাতে একান্ত প্রযোজনীও সামগ্ৰি,

বুড়িগঙ্গা পার হয়ে গ্রামের সংকীর্ণ বন্ধুর পথে চলতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো , কখনো নিচু জমি আবার কখনো শরু মেঠো পথ ধরে আমরা খোলামোড়া ছাড়িয়ে সাকোতা এসে পৌঁছিলাম. এখানে মুক্তি ফৌজ আমাদেরকে সার্চ করলো. এতদিন বেতারে যে মুক্তি ফৌজ এর কথা শুনেছি আজ তাদের সচক্ষে দেখে অভিভূত হলাম. দিন দরিদ্রের বেশে মুখে তাদের অমনিও কঠোর দৃঢ়তা. সাকতা ছাড়িয়ে আমাদের পথ চলা আবার শুরু হলো. অগনিতো নারী পুরুষ আমাদের সহযাত্র্রী , প্রাণের তাগিদে উর্ধ শাঁসে ছুটছে সবাই.

বেলা গড়িয়ে এলো , তখন বিকেল পাঁচটা. রুহিদপুর এলাম , সমুখে ছোট নদী ওপারে সঈদপুর.
ছোট একটা স্পিড বোট শতাধিক মানুষের চাপে ডুবন্ত প্রায়. একসময় প্রকান্ড লাল সূর্যটা ডুবে গেলো. সন্ধ্যার অন্ধকার ধীরে ধীরে প্রকৃতিকে গ্রাস করলো. সারাদিন অভুক্ত স্নানহীন আমরা নৌকা করে মরিচা এসে পৌঁছলাম.
পরদিন প্রাতঃকালে আমাদের যাত্রা আবার শুরু হলো. ছোট্ট স্পীডবোটটি স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা মাথায় নিয়ে ছুটে চলছে সীমাহীন উল্লাসে. পথে শ্রীনগরে মুক্তিফৌজ আবার আমাদের সার্চ করলো. , ষোলো সতেরো বছরের কিশোর মুক্তি যোদ্ধাও আছে অনেক. ওদের সবার মুখে স্মিত হাসির রেখা. এ হাসি অনেক আনন্দ ও গৌরবের.

বিকেল তিনটার সময়ে দিঘলীতে পৌঁছলাম. গোধূলি বেলায় একটা নৌকা ঠিক ক করা হলো, অনেক ভাড়া কবুল করে দুই মাঝি ভাই আমাদের পটুয়াখালী পর্যন্ত নিয়ে যেতে রাজি হলো. রাত আমাদের নৌকাতে কাটলো.
ভোর চারটার সময়ে আমাদের নৌকা ছাড়া হোল, চারিদিকে অন্ধকারের রেশ তখনো কাটেনি.
পদ্মার বুকে আমাদের নৌকা খানি ধীর শান্ত গতিতে এগিয়ে চলছে. আস্তে আস্তে অন্ধকারের রেশ কেটে গিয়ে পূব আকাশে লোহিত রঙের বর্ণচ্ছটা দেখা গেলো. অপূর্ব সুন্দর এই দৃশ্য, প্রকান্ড সূর্যটা নদীর কিনার হতে ধীরে ধীরে নিজের ঘোমটাটা উম্মোচন কোরছে. সকাল সাড়ে সাতটার সময়ে নৌকা কামরাঙ্গীর চরে থামানো হোল.
মুখহাত ধুয়ে চরের মধ্যে কিছুক্ষন হাটলাম , চারিদিকে পদ্মার পানি মাঝে মাঝে মাটি আর বালুর চর.

ঠান্ডায় পায়ের পাতাগুলো অবশ হয়ে আসতে চাইছে. চারিদিকে নিবিড় নিঃশব্দতা, সভ্য সমাজের কোলাহল এখানেনেই, নেই যুদ্ধের দামামা. অনাবিল ভালোবাসার আনন্দে মন প্রশান্তিতে ভরে উঠে.

নৌকা আবার যাত্রাপথে রওয়ানা হলো. ডান হাতের ব্যাপার সমাধা করার পর রেডিও অন করে ইন্ডিয়া স্টেশন ধরা হলো. আমরা খবর শুনলাম ঢাকের দিকে মুক্তি ও ভারতীয় বাহিনী প্রচন্ড গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে. টঙ্গী দখল করা হয়েছে , যশোর কুষ্টিয়া সিলেট রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চল মুক্তি বাহিনীর আয়ত্তে বাংলাদেশ বেতারে জয়ের উল্লাস ধোনি. ছৈয়ের ভিতর থেকে বাইরে তাকালাম , দুপাশে গাসপালা , ঘর বাড়ি গুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে. নদীর মাঝে অসংখ পালতোলা নৌকা. কিছুদূর যেতেই পচা লাশের গদ্ধে চমকে উঠলাম. নদীর কিনার ঘেঁষে বয়ে চলছে ইউনিফর্ম পরা একটি লাশ. মাথার হেলমেটটিও অক্ষত অবস্থায় ভেষে চলছে. বুকের মধ্যে কেমন যেনো শিরশির করে উঠলো. অদ্ভুত এক অনুভিতিতে মন বিষন্ন হয়ে উঠছে.
আমাদের নৌকা এগিয়ে চলছ. পথের মাঝে অনেক সাপুড়ে ও মেছোদের নৌকা সারি বেঁধে কূলে ভেড়ানো. অনেক সাপুড়ে মেয়েরা দিব্বি নৌকা বাইছে . আমাদের দেখে কোনো মেয়ে হয়তো সরস মন্তব্য করলো সঙ্গীরা হেসে উঠলো. একজন সাপুড়ে চিৎকার করে বললো ওহে সিরাজুদৌলা পালায় নাকি. আমরা সমস্বরে হেসে উঠলাম.
আমরা পটুয়াখালীর প্রায় কাছে চলে এসেছি কিন্তু রাত থাকতে পৌঁছোবার আসা ত্যাগ করতে হলো. লৌহলিয়ার কূলে ঘেঁষে আমাদের নৌকাটা যখন ধীরে ধীরে চলছিল অকস্মাৎ রাইফেলের গর্জনে আমরা চমকিত হলাম. এই নিচ্ছিদ্র কালো অন্ধকার রাত্রিতে মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে পড়লাম. মনে মনে ভাবলাম তরে এসে তরী ডুবলো, আহা শেষ রক্ষা আর বুঝি হলোনা.
মুক্তি ফৌজ এর নির্দেশে নৌকা পারে লাগানো হলো. পটুয়াখালী শহর কারফিউ. অতএব নৌকাতে রাত্রি যাপন করতে হলো.
পরদিন ১৬ ই ডিসেম্বর সকাল বেলা আমরা পটুয়াখালী এসে পৌঁছাই, শহরে লোকজনের সংখ্যা খবই কম. পালিয়ে যাবার পর এখনো সবাই ফিরে আসেনি. প্রত্যেক বাড়িতে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ছে. ভালোলাগার মুগ্ধ আবেশে মনটা ঢাকায় ফিরবার জন্য ছটফট করছে. কিন্তু ঢাকা এখনো শত্রুর কবলে. পাকিস্তানী সেনারা আত্মসমর্পণ করবে কিনা তার কোনো নিশ্চয়তা নেই. নিরাপদে পোঁছানোর আনন্দ সবার মনের মধ্যে থাকলেও, অদ্ভূত এক অনুভূতিতে সবার মনই বিষন্ন. পটুয়াখালীতে এমনকোন বাড়ি নেই যেখানে ছার্চ হয়নি. ঘরের কাপড় হতে শুরু করে হাঁস মুরগি গুলাও উধাও.

সন্ধারদিগে সবাই যখন গল্পে মশগুল ঠিক তখনি টিনের চালে গুলির টুপটাপ শব্দে আমরা সবাই চমকিতো, বড়ো ভাই দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বললো ওরা আত্মসমর্পণ করেছে. ঢাকা এখন মুক্ত স্বাধীন.
সারা পটুয়াখালীর অজস্র রাইফেল, এস এল আর , আরো আমার নামনাজানা অস্ত্রের আওয়াজে মুখরিত হয়ে উঠলো, জয়ের উল্লাসে ধ্বনিত সবার কণ্ঠ.
একই কথা. জয় বাংলা, জয় বংগবন্ধু

সত্যি এ কয়টি দিনের কথা আপন মানসপটে চির অম্লান হয়ে থাকবে.

লেখক: তারিক সালাউদ্দিন,
ডাবলিন
লিখার সময়কাল : ২ রা অগাস্ট ১৯৭৫

Facebook Comments Box