সোসাল মিডিয়ার স্বাধীনতা ও এর দোষ গুণ – সাজেদুল চৌধুরী রুবেল

0
188

সোসাল মিডিয়ার যুগ বলে কথা! মানুষ এখন আর কুনো ব্যাঙের মতো নিজেকে কুনোয় বন্দী করে রাখতে বাধ্য নয়। সোসাল মিডিয়া একটি উদার রঙ্গমঞ্চ। এ রঙ্গমঞ্চের সদস্য হতে কার না মন চায়! তার উপর যদি না থাকে কোনো খড়কুটো পোহানোর ঝামেলা। বড্ড সহজ এ পথ। তাছাড়া এ রঙ্গমঞ্চে মডারেটিংএর কোনো বাধ্যবাধকতা না থাকায় “যেমন খুশী তেমন সাজ” এর মতো যে যার ইচ্ছে মাফিক নিজেকে সাজাতে পারে। স্বীয় অস্তিত্বের ঢাকঢোল যেভাবে ইচ্ছে সেভাবে পেটাতে পারে। কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন রাখতে যেমন কোনো বাধানিষেধ নেই তেমনি সোসাল মিডিয়া বা ফেসবুকে কাক ময়ুর সেজে পেখম মেলালেও কোনো বাধা বিপত্তি, বিধি নিষেধ বা সমস্যার সম্মুখীন হয়না।

সমস্যার সম্মুখীন হয়না সে কথা ঠিক। তবে সমস্যা যে নেই তা ঠিক নয়। সমস্যা আছে, যা কিনা বিবেকবোধের সমস্যা। গাণিতিক সমীকরণের সমস্যা। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে স্বাধীন স্বত্বা দিয়ে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। তাই বলে কি স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে যা ইচ্ছে তাই করার অনুমতি সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে দিয়েছেন? নিশ্চয়ই না। বরং তিনি তাদেরকে জ্ঞান, বুদ্ধি ও বিবেক দান করেছেন যাতে ভালো ও মন্দের পার্থক্য নিরূপণে সক্ষম হয়। অবারিত স্বাধীনতায় যেনো কেউ বেসামাল না হয়ে উঠে সে জন্য আল্লাহ প্রত্যেককে বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। এ বুদ্ধিশক্তি দিয়ে মানুষ নিজেকে ও নিজের চিন্তা-চেতনা ও কর্মকে নিয়ন্ত্রণ করে। আর ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে ইচ্ছে মাফিক কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হয়। এ বুদ্ধি ও ইচ্ছাশক্তির পারস্পরিক ভারসাম্য ও সাম্যতা বজায় রেখে সামনের দিকে অগ্রসর হওয়ার যে ক্ষমতা তাই বস্তুত স্বাধীনতা। যেখানে যতো বেশি স্বাধীনতা সেখানে ততোবেশি দায়বদ্ধতা। এ দায়বদ্ধতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মানুষ যখন অতিমাত্রায় স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠে, ভালো মন্দের ভেদাভেদ ভুলে যায় তখন স্বাধীনতা মলিন হয়। কলুষিত হয়। এর গায়ে চুনকালি লাগে। সোসাল মিডিয়ার সুযোগে একদল মানুষ আজকাল পাল্লা দিয়ে চুনকালি লাগানোর কাজটি বেশ দাপটের সাথে করে যাচ্ছে, যা খুবই দুঃখজনক।

বস্তুত মানুষ যোগ্যতার চেয়েও যখন আরও বেশি নিজেকে জাহির করতে চায় তখন সে বেপরোয়া হয়ে ওঠে। পাগলা কুকুরের মতো গলায় ঘন্টি বেঁধে সামনে দৌড়াতে থাকে। অতীত আমিত্বকে নির্দ্বিধায় ভুলে যায়। এর পরিণতি কি ভালো, কি মন্দ সে বিবেচনার ধার তারা ধারে না। বরং তারা ধরাকে সরা জ্ঞান করে। ছোটবেলার গল্পটির কথা কি পাঠকের মনে আছে?

এক সন্ন্যাসী বিপদগ্রস্থ একটা ইদুরকে বাঘে পরিনত করেছিল।কিন্তু বাঘ হওয়ার পর সেই ইদুর সব ভুলে সন্ন্যাসীকেই খেতে গিয়েছিল।
পরিনতি কি হয়েছিল?
সন্ন্যাসী পুনরায় তাকে ইদুরে পরিনত করেছিল।

সুতরাং অবাধ স্বাধীনতায় যারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে, অতীত আমিত্বকে ভুলে যায় তাদের অবশ্যই পরিণতির কথাটা মাথায় রাখা উচিত। আরেকটি কথা বলতেই হয়। কবির ওই বাণী আমরা কে না জানি!
” অন্যায় যে করে আর অন্যায় যে সহে
তব ঘৃণা তারে তৃণ সম দহে “।

অর্থাৎ যারা এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কেবল ব্যক্তিগত হিংসে বিদ্বেষই চরিতার্থ করছেনা বরং বিভিন্ন দল বা গ্রুপের পতাকাতলে থেকে কখনো কখনো কারো কারো চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করছে, কখনো মিথ্যে প্রপাগান্ডায় সমাজে বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে তারা যতোটুকু দায়ী তার চেয়েও বেশি দায়ী যারা এসব দেখেও না দেখার ভান করে থাকে। প্রতিবাদের বদলে মুখে কুলুপ এঁটে থাকে। সমাজের পশ্চাদপদতা বা ধ্বংসের পেছনে এরাও কম দায়ী নয়।

বৈদিক যুগের কুরু বংশ ধ্বংস হয়েছিল কেন?
অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রর থেকেও বেশী দায়ী ছিলেন তারই স্ত্রী গান্ধারী যিনি চোখ থাকতেও চোখে ঠুলি বেঁধে রাখতেন সবসময়। তিনি শুধু সন্তান স্নেহে অন্ধ হয়ে সন্তানের অন্যায়, অনাচার বা অপকর্মকেই প্রশ্রয় দিতেন না, বরং সমাজের কিংবা রাজ্যের অনেক অসঙ্গতি দেখেও তিনি নীরব ভূমিকা পালন করতেন যা ক্রমান্বয়ে কুরু বংশকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যায়।

আজকের এ আধুনিক সমাজেও বহু গান্ধারী আছে যারা অন্যায়, অবিচার-অনাচারকে লালণ করছে। প্রশ্রয় দিচ্ছে। গা বাঁচিয়ে চলছে। এরা অন্যায়কারী অপরাধীর চেয়েও ভয়ঙ্কর। এরা সমাজের কীট। ভন্ড। সাধু সাজার চেষ্টা করে বটে, সত্যিকারের সাধু নয়।

এক শ্রেণীর মানুষ অন্যায় করছে। আরেক শ্রেণীর মানুষ বসে বসে কেবল তা দেখছে। এই দুই শ্রেণীর যাতাকলে প্রকৃত সৎ ও সত্য কথা বলা মানুষ গুলোর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এ অবস্থার পরিত্রাণ ঘটাতে হলে এখনি মাথা তুলে দাঁড়াতে হবে। কারন অপমানিত হওয়ার,ঠকবার আর মিথ্যাকথা শুনে হজম করারও একটা সীমা থাকা দরকার।

অবস্থা এমন হয়েছে যে, এখন আমরা সবাই রাজা। কেউ কাউকে মানতে বা সম্মান দিতে রাজি নয়। সন্তানের কাছে পিতা মাতা অসহায়। স্ত্রীর কাছে স্বামী তুচ্ছ। বন্ধুর কাছে বন্ধু অপমানিত। ভাইয়ের কাছে ভাই লজ্জিত। সমাজপতিদের কাছে সমাজ লাঞ্ছিত, অবমানিত।

অবাধ স্বাধীনতায় মাতোয়ারা হয়ে নিজেদেরকে আমরা যাই ভাবিনা কেনো, একটি জিনিস ভুলে গেলে চলবে না যে; এই পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষকে সৃষ্টিকর্তা স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কাজ করার জন্য পাঠিয়েছেন। যাকে যে কাজটি করার জন্য পাঠিয়েছেন সেই কাজটি তার হৃদয়ে গ্রন্থিত থাকে এবং ভেতর থেকে ঠিক সেই কাজটি করার জন্যই সে তাড়না অনুভব করে। এ তাড়নাকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করে আমাদের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অদৃশ্য শক্তি। এ শক্তি দুভাগে বিভক্ত। একটি সরল শক্তি, অন্যটি গরল শক্তি। গরল শক্তির মানুষ গুলোর কাজ হয় উগ্র গারোদের মতো। সুতরাং এদের কোনো কাজে শোক বা দুঃখ প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। কারণ প্রকৃতি মিথ্যের জয়গান করেনা এবং কাউকে কখনো কাউকে ছাড়ও দেয়না। তাই এদের কর্মই এদেরকে একদিন প্রতিরূপ ফিরিয়ে দেবে। সুতরাং সাধু সাবধান।

লিমরিক
১৩ এপ্রিল ২০২২

Facebook Comments Box