সংবাদ মাধ্যমের ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত

0
314

সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ সংবাদপত্র। সংবাদপত্র কিংবা টেলিভিশন, অনলাইন কিংবা মুদ্রিত; সবই হচ্ছে একটা মাধ্যম বা মিডিয়া। যার কারণে আমরা বলি সংবাদ মাধ্যম কিংবা সংবাদ মিডিয়া। এই মাধ্যমই হচ্ছে একটা সেতু বা ব্রিজ, যা ঘটে যাওয়া সংবাদ বা খবরাখবর পরিবাহক হিসেবে কাজ করে। সংবাদ মাধ্যমের কাজ হচ্ছে ঘটে যাওয়া খবরকে তার মাধ্যম (সংবাদপত্র বা টেলিভিশন) ব্যবহার করে মানুষের নিকট পৌঁছে দেয়া এবং মানুষ সে খবর বা সংবাদ পেয়ে একটা তথ্য সম্বন্ধে অবগত হয়।

সমকালীন বিশ্ব চরাচরের চলমান গতি-প্রকৃতি, ঘটনাপ্রবাহ, জীবনচিত্র ও দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় সংবাদপত্রে। মানুষের অধিকার হচ্ছে যা কিছুই ঘটে থাকুক না কেন তা সম্বন্ধে জানা এবং তা ই জানার অধিকার মানুষ রাখে যা প্রকৃতপক্ষে ঘটেছে। এখানে জনসম্মুখে কোন কিছু লুকিয়ে কিংবা আংশিক প্রকাশের অধিকার একটা মাধ্যম রাখেনা। কারণ তার উপর মানুষ আস্থা নিয়ে বসে আছে যে, সঠিক খবরটিই জনগণ পাবে।

সংবাদপত্র সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণস্বরূপ। দর্পণের মতই সমাজের চেয়ারা সংবাদপত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠে। 

সংবাদ মাধ্যমের অস্তিত্ব টিকে থাকে মানুষের মনন ও মস্তিষ্কে। একটা মাধ্যমের উপর মানুষের আস্থাও তৈরি হয় ধীরে ধীরে। সে আস্থা কখনো একদিনে যেমন অর্জন করা সম্ভব হয়না, তেমনি সেই আস্থাকে কেউ একদিন বিনাশও করতে পারেনা। একটা সংবাদ মাধ্যম তখনই সে আস্থা তৈরি করতে পারবে যখন সঠিক তথ্য, সত্য তথ্য, নিরপেক্ষভাবে, সঠিক সময়ে মানুষের সামনে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। মানুষ তখনই সে সংবাদ মাধ্যমকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করবে যখন মানুষ মনে করবে ঐ সংবাদমাধ্যমটি তাঁদের অধিকারের জন্য কাজ করতেছে।

সংবাদমাধ্যম বহুলাংশে অনেক ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদী, ক্ষমতাশালী, বিত্তশালীদের আপস করে চলে থাকে। অনেকক্ষেত্রে চলতে বাধ্য হয়। সেক্ষেত্রে তাদের সুবিধা দিতে গিয়ে গনমানুষের অধিকারকে খর্ব করা হয়। নিদৃস্ট কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে সমাজের বৃহদাংশকে অধিকার বঞ্চিত করা কি গণমাধ্যমের সাজে? গণমাধ্যমের কাজই ত্ব হচ্ছে বার্তা পৌঁছিয়ে দেয়া, বাকি ভালো মন্দের সিদ্ধান্ত নিবে জনগণ।

গণমাধ্যম যদি তথ্যনির্ভর বা বস্তুনিষ্ঠ না হয়, তাহলে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিপত্তি বা শক্তির অনুগত হলে সাময়িক সুবিধা মেলে বটে; কিন্তু সাংবাদিকতা হেরে যায়, মৃত্যু হয় যুগলব্ধ প্রতিজ্ঞার।

সংবাদপত্র তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারালে সবচেয়ে বেশি লাভ হয় ক্ষমতার। পুঁজি হারায় সংবাদপত্র; যার আনুগত্য থাকে জনগণের কাছে। ক্ষমতা, পেশি, অর্থ বা রাষ্ট্র যাই হোক না কেন-স্বভাবতই তা প্রতিস্পর্ধাকে সহ্য করে না। কিন্তু সংবাদপ্রবাহকে হতে হবে সরল, নিরপেক্ষ ও নির্মোহ। চমক না, নির্ভেজাল এবং প্রকৃত, সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্যই হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের হৃদপিণ্ড।

কর্তৃত্ব ও শক্তির বিপরীতে সংবাদপত্রই হলো আমজনতার কণ্ঠ। বহুত্ববাদী সমাজকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার ক্ষমতাও এ মাধ্যমের। সুস্থ জাতিগঠনের দায়ও তাই এ মাধ্যমের। গুজব, অসত্য তথ্য বা বিকল্প সত্য-যাই বলি না কেন, আধুনিক যুগে এসব নানা বিপত্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিরপেক্ষ ও আদর্শিক গণমাধ্যমই শেষ ভরসা। যে মাধ্যমের উপর মানুষ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারে।

কর্তৃত্ব ও শক্তির বিপরীতে সংবাদপত্রই হলো আমজনতার কণ্ঠ

গণমাধ্যম যদি সত্য ও নিরপেক্ষ প্রচার করে তাহলে যারা সত্য, ন্যায় ও মানুষের কল্যাণের পথে কাজ করে তাদের ভয়ের কোন কারণ থাকার কথা না।

সংবাদ মাধ্যমের সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশের মূল কেন্দ্রবিন্দু থাকবে জনগণ। জনগণ যা জানার অধিকার রাখে, তা জানানোই হচ্ছে সংবাদ মাধ্যমের মূল উদ্দেশ্য। এখানে স্বার্থগত চিন্তা করে, কিংবা কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর পক্ষপাত কিংবা বিপক্ষপাতের প্রেক্ষিতে কোন খবর প্রচার করা কিংবা প্রচার না করা একটি আদর্শিক গণমাধ্যমের ভূমিকা হতে পারে না। পক্ষপাতদুষ্ট গণমাধ্যম কখনো গনধিকার আদায়ে কিংবা গন মানুষের স্বার্থে কাজ করতে পারে না।

একজন নিরাপত্তাকর্মীর ব্যক্তিগত পছন্দ ও অপছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু দায়িত্বের ক্ষেত্রে এসে সে সবাইকে সমান নিরাপত্তা দিবে। একজন রাজনীতিবিদ হয়ত একটি দলের সমর্থক হয়ে থাকে, কিন্তু তার সেবা হবে দলমত নির্বিশেষে। তেমনি একজন ডাক্তার, একজন শিক্ষক, একজন আমলা, একজন খেলোয়াড়, যে কোন পেশা শ্রেণীর মানুষের নিজস্ব পছন্দের ব্যক্তি, দল, মত কিংবা ধর্মীয় পছন্দ ও পছন্দ থাকতে পারে, কিন্তু দায়িত্বের ক্ষেত্রে এসে তাকে হতে হবে নিরপেক্ষ; তার সেবা থাকবে সবার জন্য সমান। ঠিক তেমনি একজন সংবাদকর্মীও এর ব্যতিক্রম নয়।

সংবাদপত্রকে বলা হয়ে থাকে গণতন্ত্রের সদাজাগ্রত পাহারাদার। সংবাদপত্র হচ্ছে সভ্যতার অগ্রগতির প্রমাণপত্র এবং নির্যাতিতের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের অধিকার। জনগণের অধিকার রক্ষা করাই যেন হয় একটি সংবাদ মাধ্যমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য; কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার্থে নয়।

গণমাধ্যম হওয়া উচিত গনমানুষের, হাতে গোনা মানুষের জন্য নয়

ওমর এফ নিউটন
আইরিশ বাংলা টাইমস

Facebook Comments Box