করোনার রাজ্যে ঈদের চাঁদ ঝলসানো রুটি

0
538
Shajedul_Chowdhury

করোনার রাজ্যে ঈদের চাঁদ ঝলসানো রুটি
সাজেদুল চৌধুরী রুবেল


ঈদুল ফিতর মুসলিমদের সবচেয়ে বড়ো ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু এ উৎসব এখন আর আগের মতো নেই। এর গায়ে করোনার দাগ লেগেছে। নিষ্ঠুর করোনার তাণ্ডব নৃত্যের কাছে হারিয়ে যাচ্ছে উৎসবের চিরাচরিত গৌরব। শুধু এ উৎসব কেনো, সবল ধর্মাবলম্বী মানুষের ধর্মীয়, জাতীয়, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উৎসবের চেহারাই আজ মলিন।

উৎসব মানেই আনন্দ। কিন্তু শোকে কাতর মনমরা হৃদয়ে এ আনন্দ কতটুকু রেখাপাত করতে পারে! বেঁচে থাকাই যেখানে মানুষের এখন চ্যালেঞ্জ সেখানে উৎসবের আনন্দ বন্যায় হাবুডুবু খেতে কি সত্যিকারার্থে তাদের মন সায় দেয়? আনন্দ একটি অপেক্ষিক বিষয়। এটাকে জোর করে কেউ গ্রহণ বা বর্জন কোনোটাই করতে পারেনা।

প্রতি বছর পবিত্র রমজান শেষে আনন্দের বার্তা নিয়ে আমাদের সামনে ঈদুল ফিতর আসে। কিন্তু গতবছর থেকে তা ভিন্ন ধারায় আসছে। করোনা মহামারীর কবলে পড়ে তামাম দুনিয়ার চিত্র বদলে যাবার সাথে সাথে মুসলিমদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরের আনন্দও বদলে গেছে। ঈদের জামাতে নামাজ পড়ার যে স্বতস্ফূর্ত আনন্দ ছিলো তাও অনেকটা দমে গেছে। কেনাকাটায় নেই কোনো জৌলুস। নামাজ শেষে কোলাকুলি বা করমর্দনের চিরাচরিত প্রথা আজ অবরুদ্ধ। মোট কথা আগে যেভাবে আমরা হৈচৈ,উত্তাপ ও আড়ম্বরের সাথে ঈদ পালন করতে সক্ষম হতাম তা এখন আর মোটেও সম্ভব নয়। স্বাস্থ্যবিধির বাইরে গিয়ে উৎসবকে তো আর “আপদে” পরিণত করা যায়না!

উৎসব বা আনন্দকে বেগবান করার জন্য অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়। পূর্ণিমার চাঁদ যেনো ঝলসানো রুটি। কবির এ কথাটিকে ধার নিয়ে আমি বলতে চাই, করোনার রাজ্যে ঈদের চাঁদ ঝলসানো রুটি করোনা মহামারী ঠেকাতে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর ধরে লকডাউন চলছে বিশ্ব জুড়ে। ফলে অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে পড়েছে প্রতিটি দেশে। কর্ম সংস্থান হারিয়ে মানুষ দুবেলা দুমুটো খেয়েপরে বাঁচার জন্য ইয়ানফসি ইয়ানফসি করছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এখানেও একই ভাবে দেখা দিয়েছে অর্থনৈতিক মন্দা। এমন এক মন্দার কবলে পড়ে যখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠী হা হুতাশ করছে তখনই এলো আমাদের প্রাণের উৎসব ঈদুল ফিতর। অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে গেলেও সময়ের চাকা কখনো স্থবির হয়না। নিজস্ব গতিতে এগিয়ে চলে। তাই ভালো সময়, মন্দ সময় বলে কোনো কথা নয়, উৎসবের সময় উৎসব আসবেই। এবারও তাই হলো। ভালো মন্দের তোয়াক্কা না করে আমাদের সামনে এলো ঈদ।

আমরা জানি, ঈদ ঘরে ঘরে, জনে জনে আনন্দ বয়ে আনে। ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও ধনী গরিব নির্বিশেষে সকলকে এক কাতারে শামিল করার চেতনায় উজ্জীবিত করে। কল্যাণের পথে ত্যাগ ও তিতিক্ষার মন্ত্রে দীক্ষিত করে। ঈদের আগে রোজার একটি মাস সংযম ও আত্মত্যাগের মাস। রোজার কঠোর অনুশীলন ব্যক্তিগত আত্মশুদ্ধি ও গরীব দুঃখী অনাহারীদের কষ্ট অনুভবের প্রেরণা দেয়। এ সময় গরীব দুঃস্থদের ঈদের আনন্দে শরিক করার জন্য রয়েছে ফিতরা ও যাকাতের বিধান, যা বিত্তবান প্রতিটি মুসলমানের জন্য ফরজ। আমার বিশ্বাস, সমাজের সক্ষম ব্যক্তিরা যদি যাকাত আদায়ের ক্ষেত্রে সঠিক শরীয়া আইন অনুসরণ করেন তবে অভাবীদের কষ্ট লাগবে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করবে।

যতো কঠিন সময়ের মধ্যেই ঈদ আসুক না কেনো, এর মূল তাৎপর্য- বিভেদ মুক্ত জীবনের উপলব্ধি থেকে মোটেও সড়ে যাওয়া যাবেনা। ভুল ভ্রান্তি, পাপ পঙ্কিলতা প্রতিটা মানুষের জীবনেই কমবেশি ইচ্ছে বা অনিচ্ছায় এসে থাকে। কিন্তু পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালা চান মানুষ পাপতাপ ও বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে সৎপথে ফিরে আসুক। সম্প্রীতির আনন্দ ধারায় সিক্ত হয়ে উন্নত জীবন লাভ করুক। ঈদুল ফিতর মূলত মানুষকে এ শিক্ষাই দেয়। দিবসটির উৎসব তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে সমাজের ধনী দরিদ্রের সম্প্রীতি ও সহমর্মিতার মধ্য দিয়ে। শ্রেনীবৈষম্য বিসর্জনের মধ্য দিয়েই এ আনন্দ সার্থক হয়ে ওঠে।

করোনার ভোগান্তির কারণে ঈদের চাঁদকে আমরা ঝলসানো রুটির সঙ্গে যতোই তুলনা করিনা কেনো, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, আপন জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়ার অনুভূতিই আলাদা। ঈদ বিভেদ বৈষম্যহীন ভ্রাতৃত্ব চেতনায় ঋদ্ধ এক আনন্দ উৎসব বিনোদনের দিন। এ দিনে সবার সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়াটাও এক ধরনের ইবাদত।

রমজান আমাদেরকে চিত্ত শুদ্ধির যে শিক্ষা দিয়েছে সে শিক্ষার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শান্তি ও শ্রেয়বোধের চেতনায় স্থিত হতে হবে। ঈদুল ফিতর উদযাপনের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সকল প্রকার হিংসা হানাহানি মুক্ত হোক। সম্প্রতি আল আকসা মসজিদে মুসুল্লিদের উপর আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করার যে জঘন্যতম ঘটনার উদ্ভব ঘটানো হয়েছে এ ধরনের ঘৃণ্য সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিভীষিকা দূর হোক। সকল শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দের বন্ধন আরও সুদৃঢ় হোক, আনন্দে ভরে উঠুক তাবৎ পৃথিবী।

করোনার দাপটে পৃথিবী অচল। এ অচলাবস্থার জন্য উৎসবের প্রকৃত স্বাদ থেকে আমরা বঞ্চিত। কিন্তু এ পরিস্থিতি চিরদিন থাকবেনা। এর আগেও বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহামারী এসেছে। কোনোটাই স্থিরস্থায়ী হতে পারেনি। করোনার আতংকও একদিন শেষ হবে। ইতোমধ্যে এর ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়েছে। জনগণ তা গ্রহণও করছে। বিশ্বের সকল মানুষের উপর এর প্রয়োগ সম্পন্ন হলে পৃথিবী অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠবে। তখন করোনা অর্থাৎ কভিড-১৯কে একটি নিছক ঠান্ডা জ্বর ছাড়া আর কিছুই মনে হবেনা। আমি সেই স্বাভাবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা রেখে সবাইকে জানাই পবিত্র ঈদের শুভেচ্ছা- ঈদ মোবারক।

লিমরিক
১৩ মে ২০২১
লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক

Facebook Comments Box