আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশীদের কেন্দ্রীয় সংগঠন কেন প্রয়োজন?

0
37

মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করাই মানুষের বৈশিষ্ট্য। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল বলেছিলেন ”স্বভাবের দিক থেকে সব মানুষই হল সামাজিক প্রাণী’’। তাঁর মতে, যে কোন ব্যক্তির অস্তিত্বের পরিপ্রেক্ষিতে আগে আসে সমাজের গুরুত্ব। অর্থাৎ, এই পৃথিবীর কোন মানুষই সমাজের ঊর্ধ্বে নয়। মানুষকে বসবাস করতে হলে কোনো না কোনো সমাজেরই আশ্রয়েই জীবনধারণ করতে হয়।

সংগঠন কি এবং  কেন প্রয়োজন? 

সংগঠন হচ্ছে একটি সামাজিক ব্যবস্থা যা কতিপয় বিশেষ উদ্দেশ্য অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা কেউ কেউ সংগঠনকে সোশ্যাল ইউনিট আবার কেউ সামাজিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মূল কথা হল, সংগঠন হলো একটি লক্ষ্য অভিমুখী, পরিকল্পিত ও ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা সত্ত্বা যা একক বা দলীয় উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়তা করে থাকে।

একটি সমাজের আকার যখন বড় হয়, তখন তার মধ্যে দরকার পড়ে আইন, নিয়ম-নীতি ও সঠিক দিক নির্দেশনা। স্বার্থগত কারণেই একে ওপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে উঠা লাগে, দরকার হয় একে অন্যের সাহায্য সহায়তার। একই সমাজে বাস করতে গেলে যেমন একে অন্যের সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া যায়, তেমনি তৈরি হয় দ্বন্দ্ব, সংঘাত, মতানৈক্যের। সুতরাং একটি সমাজ সঠিক ভাবে পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন পড়ে সংগঠনের। একটি উপযুক্ত সংগঠনের নেতৃত্বে একটি সমাজ পরিচালিত হতে পারে মসৃণভাবে।

সংগঠনের নেতৃত্ব কে দিবে, তা মূলত নির্ধারণ করে সমাজের ব্যক্তিবর্গরাই। আবারো অ্যারিস্টটলের কথায় ফিরে যাই; তিনি সংগঠন বিষয়ে বলতে গিয়ে বলেন, ”সংগঠন মানুষের নেতিবাচকটা থেকে বেরিয়ে আসতে সহযোগিতা করে। সামাজিক সংগঠন হতাশা ও দুঃখবোধ থেকে বেরিয়ে আসতেও মানুষকে সাহায্য করে। চলার পথে একে অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিকতা তৈরী করে। জীবনের প্রতি মুহূর্তকে উপভোগ করার পরিস্থিতি ও তৈরী করে দেয় সংগঠন’’।

আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী সংগঠন কেন দরকার? 

এখন হয়ত প্রশ্ন আসবে, আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশীদের জন্য আলাদা করে কেন সংগঠন প্রয়োজন? এখানে তো সরকার থেকে শুরু করে স্থানীয় কাউন্সিলর সবই রয়েছে। হ্যাঁ, এটা শতভাগ ঠিক যে, আয়ারল্যান্ডের প্রশাসনই এখানকার সমাজ নিয়ন্ত্রণের জন্য যথেষ্ট। কিন্তু তারপরেও কেন বাংলাদেশীদের জন্য একটি গোষ্ঠীয় সংগঠন দরকার তার উপর আলোকপাত করা যাক।

আমরা যারা বাংলাদেশী বংশদ্ভুত এখানে রয়েছি, আমাদের ভাষা ভিন্ন, আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন, আমাদের ধর্ম ভিন্ন, আমাদের খাদ্যাভ্যাস ভিন্ন। তারপরে আমাদের আড্ডা দেয়ার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আমাদের কথা বলার ঢং আলাদা, আমাদের উদযাপনের রীতি আমাদের মতই; যার কারণে আমাদের আনন্দ-বেদনার অনুভূতিও অন্যরকম। এই বাঙ্গালিয়ানার জাল আমি চাইলেও ছিন্ন করতে পারব না। আমার চারপাশে পরিবেষ্টিত থাকতে হবে বাংলাদেশীদের দ্বারা, আমার কানে আসতে হবে বাংলায় উচ্চারিত ধ্বনি, আমার জিহ্বায় লাগতে হবে বঙ্গীয় রসনা স্বাদ। এবং এসব কারণেই আমাকে বাস করতে হবে বাঙালি পরিবেষ্টিত সমাজে।

সুতরাং আমরা নিজেরাই গড়ে তুলি সমাজের মাঝে সমাজ। যে সমাজ পরিচালিত হয়না জাতীয় সংবিধান অনুযায়ী, কিন্তু একটি আবেগতাড়িত সংবিধান এখানে গড়ে উঠে ধীরে ধীরে।

যেহেতু এখানে গড়ে উঠেছে একটি জাতিগত সমাজ, সুতরাং উপরোক্ত উদাহরণ অনুযায়ী এর পরিচালনার জন্য স্বভাবজাতভাবেই প্রয়োজন পড়ে একটি সংগঠনের। এবং সংগঠনটির একটি নেতৃত্ব থাকবে, যেখানে নেতৃত্ব দিবে সমাজের জনগণ দ্বারাই নির্বাচিত কেউ।

আয়ারল্যান্ডে আমরা যারা বসবাস করে আসতেছি, আমরা অবশ্যই অনেক ক্ষেত্রেই অনুভব করে থাকি একটি কেন্দ্রীয় সংগঠনের। যেমনঃ আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী হাই কমিশন স্থাপন, বাংলাদেশে আয়ারল্যান্ডের হাই কমিশন স্থাপন, বাংলাদেশী কমিউনিটির বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কথা বলতে হলে কমিউনিটিকে নেতৃত্ব দেয় এমন নেতার প্রয়োজন। কারণ প্রশাসন অথবা কতৃপক্ষ চাইলেই যে কারো সাথে যে কোন বিষয়ে কথা বলবে না। সে জন্য প্রয়োজন কমিউনিটি কতৃক নির্বাচিত নেতৃবর্গ, যারাই নেতৃত্ব দিবে কমিউনিটিকে।

এছাড়াও অনেক বাংলাদেশী প্রবাসে অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকেন, যারা সাহায্যের জন্য কোথায় যাবেন তা অনেকেই জানেন না, সেক্ষেত্রে কমিউনিটিকে নেতৃত্ব দেয় এমন সংগঠন এগিয়ে আসতে পারে তাঁদের সহায়তায়। দেশীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন, দেশ থেকে আগত টুরিস্ট, ছাত্র ও চাকুরীজীবীদের সুবিধা অসুবিধা দেখভাল করা। কেউ মারা গেলে মুসলমান কবরস্থানের ব্যবস্থা করা কিংবা লাশ দেশে পাঠানোর জন্য সহযোগিতা করা, আয়ারল্যান্ডে কেউ চিকিৎসা করতে না পারলে আর্থিক সহায়তা প্রদান করাসহ এমন অসংখ্য কার্যাবলী রয়েছে যা একটি সংগঠন পালন করতে সক্ষম।

সমাজের মধ্যে একে অন্যের মধ্যে বিশৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতি যখন তৈরী হয়, সেই ক্ষেত্রে ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক মধুর করার পেছনে একটি আদর্শ সামজিক সংগঠনের ভূমিকা অগ্রগণ্য। একটি আদর্শ সংগঠনই পারে একে অন্যের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করতে।

বাংলাদেশী সংগঠন ”আবাই” 

সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে এবং আয়ারল্যান্ডে বসবাসরত বাংলাদেশী কমিউনিটির কল্যাণে ভূমিকা রাখার নিমিত্তে গঠিত হয়ে বাংলাদেশী কমিউনিটি ভিত্তিক কেন্দ্রীয় সংগঠন ”অল বাংলাদেশী এসোসিয়েশন আয়ারল্যান্ড’’, যা সবার কাছে আবাই বা ABAI নামে পরিচিত। ”আবাই” আমরা আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশী কমিউনিটির মুখপাত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারি। একটা সামাজিক সংগঠন কখনো টিকে থাকতে পারবে না সমাজের সবার গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া। একটা সমাজের জন্য যেহেতু একটা সংগঠন প্রয়োজন, সেহেতু ”আবাই” কে গ্রহণযোগ্য করে তোলা সমাজের সবারই দায়িত্ব। অপরপক্ষে ”আবাই” যদি সমাজের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য পূরণে ব্যার্থতার পরিচয় দেয় তাহলে তা আপনা আপনিই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

আবাই এর নির্বাচন খুব শিগ্রই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। আসুন আমরা সবাই নির্বাচনকে সাফল্যমণ্ডিত করতে সয়াহতা করি। যথাসময়ে ভোটার হয়ে সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে পারে এমন যোগ্য ব্যক্তিকে ভোট দিয়ে নেতৃত্ব তুলে দেই এবং যারা সমাজের কল্যাণে অবদান রাখতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তাঁরা যেন নেতৃত্বের দায়ভার গ্রহণ করে কমিউনিটির কল্যাণে নিয়োজিত হতে পারি।

শেষকথা

আর. এম. ম্যাকাইভার বলেন, ‘’আমাদের সামাজিক সম্পর্কের জটিল জালই হচ্ছে সমাজ’’। আমরা কেউই এই জটিল জাল থেকে বের হতে পারব না। কিন্তু এই জটিল জালে থেকে কিভাবে সুখকর সমাজ প্রতিষ্ঠিত করতে পারে সে লক্ষ্যে আমাদের কাজ করা উচিত এবং তা একমাত্র সম্ভব হবে সংঘবদ্ধ থেকে, আর সংঘবদ্ধ থাকার প্রধান উপকরণ হচ্ছে সংগঠন।

 

ওমর এফ নিউটন
প্রধান বার্তা সম্পাদক

Facebook Comments Box