আয়ারল্যান্ডে এই প্রথম সাহিত্য সভা অনুষ্ঠিত ও প্রতিষ্ঠিত

0
600

মানুষের মন ও মনন কে সজীব ও সুন্দর করে তুলতে সাহিত্যের ভূমিকা অপরিসীম। সাহিত্য মানুষের জৈবিক ও আত্মিক উৎকর্ষ সাধন করে থাকে। মানুষের চিন্তা, চেতনা, আবেগ, অনুভূতি হচ্ছে সাহিত্যের উপজীব্য বিষয়। আয়ারল্যান্ডে বাংলাদেশিদের একঘেয়ে জীবনকে সৃজনশীল ও ক্রিয়াশীল করার লক্ষ্যে গত ১২ই নভেম্বর রোজ রবিবার প্রথম বারের অনুষ্ঠিত হল সাহিত্যে সভা নামে সাহিত্যের আসর।

উক্ত আসরে আয়ারল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাহিত্য প্রেমী ও সাহিত্যের সান্নিধ্যে থাকা ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল। গল্প, কবিতা, আবৃতি, আড্ডায় মুখরিত সাহিত্য সভাটি ছিল প্রাণবন্ত। নানা রকম আলাপে, কত রকম হাস্যে, খুনসুটিতে, আনন্দে মিলেমিশে একাকার হয়ে ছিল সভার পরিবেশ।

কেউ কথা বলেছে প্রেমের ভাষায়, কেউ বলেছে আবেগের ভাষায়, কেউ কথা বলেছে রাজনীতির ভাষায়, কেউ বা আবার ইতিহাসের। কারো কথায় ঝরে পড়েছে স্বপ্ন, কারো কথায় ছিল বাস্তবতার শিক্ষা। কারো বানীতে উঠেছে হাসির রোল, কারো বানীতে ঝরেছে অশ্রু জল। এটাই হচ্ছে সাহিত্য, যা মানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করে, জাগিয়ে তোলে অন্তর সত্ত্বাকে।

কমিউনিটির ও উদার সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব জনাব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমানের দিক নির্দেশনায় এবং কবি ও লেখক জনাব সাজেদুল চৌধুরী রুবেলের উদ্যোগে এ সভাটি লিমরিকের স্টুডেন্ট ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন জনাব ডঃ আরমান ও তাঁর স্ত্রী মিসেস রহমান, ডঃ শ্যামল হোসাইন, ডঃ লুবনা হোসাইন ও তাদের দুই মিষ্টি তনয়া লিলি এবং রোজ, সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান, আজাদ তালুকদার, সৈয়দ জুয়েল, শাহাদাত হোসাইন, আখতার হোসেন আব্দুর রহিম ভুঞা, কবির আহমেদ, মাহিদুল ইসলাম সবুজ, মোহাম্মদ মোস্তফা, আমিনুল ইসলাম রনি, ওমর ফারুক রাহাত, ওমর ফারুক নিউটন, আনোয়ারুল হক আনোয়ার, সাজেদুল চৌধুরী রুবেল ও প্রমুখ।

যেহেতু প্রথম সভা সেহেতু সুনির্দিষ্ট কোন এজেন্ডা ছিলোনা। উপস্থিত সবাই খোলামেলা আলোচনা করেছেন। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে কন্ঠকহীন ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। আয়ারল্যান্ডে বাংলাভাষা ও সাহিত্যচর্চা এবং কবি সাহিত্যিকদের অভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কথা বিবেচনা করে একটি “সাহিত্য আসর” বা “সাহিত্য ভাবনা” কিংবা “সাহিত্য সভা” এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। তারই প্রেক্ষাপটে উপস্থিত সবার সম্মতিক্রমে “সাহিত্য সভা” নামটিকে নির্বাচন করা হয়। “সাহিত্য সভা” এর প্রথম সভায় নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত সমুহ গৃহীত হয়-

১) প্রতি মাসে “সাহিত্য সভা” এর ব্যানারে একটি করে সভা অনুষ্ঠিত হবে।
২) প্রত্যেক সভায় কোন একক ব্যক্তির সভাপতিত্ব করার গতানুগতিক পদ্ধতি বা রেওয়াজকে বাদ দেয়া হয়েছে। সভায় সবাই সদস্য, কোন সভাপতি থাকবেনা। তবে যে কোন একজনকে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সভা পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হবে।
৩) প্রতিটি সভা সুনির্দিষ্ট এজেন্ডার ভিত্তিতে পরিচালিত হবে।
৪) কবি/সাহিত্যিকদের উৎসাহ উদ্দীপনা দেয়ার জন্য একেকটি সভায় একেকজন কবি বা সাহিত্যিকের লেখা নিয়ে সুনির্দিষ্ট ভাবে আলোকপাত করা হবে।
৫) নতুন প্রজন্মকে সাহিত্যপ্রেমী করে তোলার জন্য সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে।
৬) নতুনদের ভেতরে ঘুমন্ত সাহিত্যকে জাগিয়ে তোলার জন্য তাদেরক সাহিত্য সভামুখী করে উৎসাহ প্রদান করতে হবে।
৭) সাহিত্য সভার আত্মপ্রকাশ, এর কার্যক্রম ও ধারাবিবরণী জনসমক্ষে তোলে ধরা যাতে করে আগ্রহী সাহিত্যমনা ব্যক্তিরা অতি সহজেই তারা তাদের নিজেদের ঠিকানায় পৌঁছাতে পারেন।

এ সিদ্ধান্তসমুহ গ্রহণের পর শুরু হয় গদ্য পাঠ ও কবিতা আবৃত্তির পর্ব। প্রথমেই নিজের লেখা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক বই “একজন মুক্তিযোদ্ধার ডায়েরি” থেকে গদ্য পাঠ করেন কথা সাহিত্যিক ডঃ আরমান রহমান। মুক্তিযুদ্ধের উপর ব্যতিক্রমী এক গদ্য পাঠ মন্রমুগ্ধের মতো সবাই শুনছিলেন। একে একে সবাই কবিতা পাঠ করেন। তবে সবার দৃষ্টি কেড়ে নেয় ডঃ শ্যামল ও মিসেস শ্যামল-এর দুই কন্যা যথাক্রমে লিলি ও রোজের আবৃত্তি। এরপর স্বরচিত কবিতা পাঠ করেন কবি ড শ্যামল, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান, সাংবাদিক ও কবি সৈয়দ জুয়েল, সাংবাদিক মাহিদুল ইসলাম সবুজ, কলামিস্ট ও রিপোর্টার ওমর ফারুক নিউটন, কবি ও লেখক সাজেদুল চৌধুরী রুবেল। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতা আবৃত্তি করেন আইরিশ বাংলা টাইমসের সম্পাদক আব্দুর রহিম ভূঞা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার কয়েকটি চরণ আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট কমিউনিটি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ মোস্তফা। ওমর ফারুক রাহাত আবৃত্তি করেন দুটো কবিতা। সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন কমিউনিটি ও সাহিত্যমনা ব্যক্তিত্ব জনাব শাহাদাত হোসাইন। তিনি এবার কবিতা পাঠ করেননি তবে পরপর্তী সভায় স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করবেন বলে প্রত্যয় প্রকাশ করেন। গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন আবাই এর সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক আনোয়ার, লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবির আহমেদ, সাহিত্যপ্রেমী আখতার হোসেন সহ অনেকেই।

যদিও সাহিত্যের আড্ডা তবুও সভাটিতে ভিন্ন মাত্রার স্বাদ এনে দিয়েছিলেন লিমরিক সিটি মেয়র জনাব আজাদ তালুকদার একটি গান পরিবেশনের মধ্য দিয়ে। মোট কথা, গোটা আড্ডা জুড়ে ছিলো নতুনত্ব, হাসিখুশি ও প্রাণবন্তের ছাপ।

পরিশেষে জনাব সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান দ্বিতীয়বারের মতো সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের “কেউ কথা রাখেনি” কবিতাটি আবৃত্তি করেন ও সাহিত্য সভা বিষয়ক কিছু দিকনির্দেশনা মৃলক কথা বলেন। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সভাটির পরিচালনায় ছিলেন জনাব সাজেদুল চৌধুরী রুবেল। তিনি সভার সমাপ্তি ঘোষণার মধ্য দিয়ে দূর দুরান্ত থেকে আগত সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান এবং অনিচ্ছা সত্বেও বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও সময় সংকীর্ণতার জন্য যাদের কাছে এবার তিনি পৌঁছাতে পারেননি তাদের কাছে বিনীত ভাবে দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পরবর্তী সভায় তাদের উপস্থিতি নিশ্চিতকরনের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

সাহিত্যের মাধ্যমে যোগাযোগ ঘটে হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, মিলিত হয় আত্মার সাথে আত্মা। আত্মার সাথে আত্মার এই যোগাযোগ বজায় রাখতে প্রতি মাসে এমন একটি সাহিত্য সভা বা সাহিত্য আড্ডা করার কথা জানান উপস্থিতগন। এবং এই আড্ডা একেক মাসে একেক শহরে মিলিত হবার কথা জানানো হয়। জনাব মুস্তাফিজুর রহমান আগামী সভা ডাবলিনে করার কথা ব্যাক্ত করেন।

সাহিত্যপ্রেমী যে কেউ এই আসরে যোগ দিতে পারেন। দেখা হবে অন্য কোন আসরে, অন্য কোন শহরে।

Facebook Comments Box