আনুগত্যহীন সন্তানদের বোধোদয় ঘটুক – সাজেদুল চৌধুরী রুবেল

0
435

আনুগত্যহীন সন্তানদের বোধোদয় ঘটুক
সাজেদুল চৌধুরী রুবেল


 

গত ২৫ মে আমার বড়ো মেয়ের জন্মদিন গেলো। চৌদ্দ বছরে পদার্পণ করলো। চৌদ্দ বছর আগের এ দিনে রৌদ্রস্নাত সকালে তার জন্ম হয়। প্রথম সন্তানের বাবা হিসেবে একটু বেশিই পুলকিত হয়েছিলাম। “বাবা” কি জিনিস তা আমি প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম যেদিন আমার বাবার মৃত্যুসংবাদ শুনি। পুরো পৃথিবী শূন্য মনে হয়েছিলো। অমাবস্যার গাঢ় অন্ধকার নেমে এসেছিলো আমার চোখের পাতায়। ফোটা ফোটা বেদনাশ্রুর মাঝে সেদিন খুঁজে পেয়েছিলাম “বাবা” শব্দটির মর্মার্থ। আবার যেদিন আমার মেয়ের জন্ম হলো সেদিনও “বাবা” শব্দের অর্থ খুঁজে পাই। সন্তানের প্রতি বাবার দায়িত্ব ও মমত্ববোধ টের পাই। একদিন বাবাকে হারিয়ে বেদনাশ্রুর মাঝে, অন্যদিন নিজে বাবা হয়ে পিতৃত্বের গৌরবময় আনন্দাশ্রুর মাঝে বাবার স্বরূপ খুঁজে পাই।

বাবা কে বা বাবার স্বরূপ বলতে কি বুঝায়? বাবা কি কেবল সন্তান জন্ম দিয়েই দায়িত্ব শেষ করে থাকেন? নিশ্চয়ই না। বরং সন্তানকে লালন পালন করা, ভরণপোষণ করা, সন্তানের নাক মুখ ফুটিয়ে তোলার জন্য যা যা করনীয় তাই করেন বাবা। এমনকি রক্ত বিক্রির প্রয়োজন হলে তাই করেন তিনি নির্দ্বিধায়। নিজে না খেয়ে, না পরে সন্তানকে খেতে ও পরতে দেন। নিজে ছেঁড়া কাপড়ে দিনাতিপাত করলেও সন্তানকে সাহেবী পোশাক কিনে দিতে যতোই কষ্ট হোক কৃপনতা করেননা। নিজে ওষুধ না কিনে সন্তানকে হরলিক্সের পয়সা দেন। মাসের বেতনটা নিজ চোখে দেখার আগেই সন্তানের হাতে তুলে দেন। সংসারের অন্য চাহিদা কিভাবে মেটাবেন সে চিন্তা কখনো বাবা করেননা। সন্তানের আবদার, চাহিদা মেটানোর মাঝেই যেনো বাবা তৃপ্তি বা সার্থকতা খুঁজে পান।

এবার মা’র কথায় আসি। বাবা সংসার চালান, ছেলেমেয়েদের আর্থিক চাহিদা মেটান, জীবন লুটিয়ে দেন সবই ঠিক আছে। এরপরও মা’র ত্যাগ তিতিক্ষার কাছে এসব তুচ্ছ। এ জন্যই আমাদের প্রিয় নবী মা’র কথা তিনবার বলার পর বাবার কথা একবার বলেছেন। মা শুধু দশ মাস দশ দিন গর্ভেই ধারণ করেননা, জীবন বাজি রেখে সন্তানের জন্ম দেন। বুকের দুধ খাইয়ে তাদের রক্তমাংস গড়ে তুলেন। সন্তানের কিছু হলে মা পাগল হয়ে যান। সন্তানের জীবন বাঁচাতে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করেননা। কথিত আছে, স্ত্রীর কথায় ছেলে মাকে বনবাস দেয়। মাকে জঙ্গলে ফেলে আসার সময় আকাশের অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকাতে থাকে। ঝড়তুফানের স্পষ্ট পূর্বাভাস। রাস্তায় ছেলের বিপদ হতে পারে ভেবে মা আল্লাহর কাছে দোয়া কামনা করলেন যেনো তাঁর ছেলে সহিসালামতে বাড়ি পৌঁছতে পারে। নিজে জঙ্গলে একা একা মারা যাবেন সেই ভাবনা তাঁকে তাড়িত করেনি। মা যখন আল্লাহর কাছে এ ফরিয়াদ করেন ছেলের কানে তা বাজে। মা’র এমন মহানুভবতা ও উদারতায় ছেলের ভুল ভাঙ্গে। মায়ের পদতলে এসে ক্ষমা ভিক্ষা চায়। মা তাকে ক্ষমা করে দেন।

মায়েরা এমনই। সহজেই ক্ষমা করে দেন। কখনো সন্তানকে অভিশাপ দেননা। তবে তাদের অভিশাপ দিতে হয়না। তাদের আদেশ উপদেশ অমান্য করাই অভিশাপ। তাদের অন্তরে বিন্দু পরিমাণ আঘাতের আচর লাগানোই অভিশাপ। এই অভিশাপে কেউ পুড়ে মরে, কেউ বা আবার আশীর্বাদে বায়েজিদ বোস্তামি কিংবা ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর হয়।

কিছুদিন আগে মা দিবস গেলো। সামাজিক মাধ্যমে বেশ উচ্ছ্বস পরিলক্ষিত হলো। আবার যখন বাবা দিবস আসবে তখন হয়তো একই চিত্র দেখা যাবে। বিশেষ দিবস গুলোতে বাবা মা”র প্রতি যে দরদ, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধের বহিপ্রর্কাশ ঘটে তার এক দশমাংশও যদি বাস্তবে প্রতিফলিত হতো তবে পৃথিবীটা আরও বেশি সুন্দর ও সুখকর হতো। দেশে যে বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে তারও কোন প্রয়োজন হতোনা।

আমি অবাক হই যখন দেখি আমাদের মধ্যে যারা শিক্ষিত, যারা জ্ঞানগরিমার বড়াই করে বেড়ায় তাদেরই একটা বড় অংশ মা বাবাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবহেলা, অনাদর ও অশ্রদ্ধা করে থাকে। এ ধরনের অসংখ্য উদাহরণ আমাদের চোখের সামনেই ভেসে বেড়াচ্ছে। কিছুদিন আগেও যে এক বিসিএস কর্মকর্তা তার মাকে কমলাপুর স্টেশনে ফেলে গিয়েছিলো তা বেশ কয়েকটি পত্রিকায় ছাপা হয়। আবার এমন অনেক পন্ডিত ব্যাক্তিবর্গ আছেন যারা মুখে ধর্মের বুলি আওড়ান, সময় সময় কোরআন হাদিসের সবক দান করে সামাজিক মাধ্যমের চিত্ত গরম করে তুলেন তারাও মা বাবাকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে কুণ্ঠিত হননা। মা বাবার অবাধ্য হওয়াকে কোনো কঠিন পাপ মনে করেননা। বরং আপাদমস্তক শরিয়তের তকমাধারী হিসেবে নিজেদেরকে তারা বেহেশতের বাদশাহ হিসেবে ভাবেন।

মা বাবাকে অমান্য করে, মা বাবার বুকে বিষতীর ছুঁড়ে বেহেশত তো দূরের কথা, হাবিয়া দোজখে জায়গা মেলবে কিনা সেটাই ভাববার বিষয়। যাদের অছিলাতে এ পৃথিবীতে আসা, এ পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ উপলব্ধি করা সম্ভব হয়েছে, যারা জীবনের সর্বোচ্চ ত্যাগতিতিক্ষা করে শুধুমাত্র সন্তানের সুখের জন্য, যাদের ‘উফ” উচ্চারণে আল্লাহর আরশ কেঁপে ওঠে, নিজের গায়ের চামড়া দিয়ে জুতো বানিয়ে দিলেও যাদের ঋণ শোধ হবার নয় সেই মা বাবার মনে আঘাত দিয়ে, তাদের রাতের ঘুমকে হারাম করে দিয়ে যদি কেউ ইবাদতের ঝান্ডা হাতে নিয়ে দৌড়ে বেড়ায় তবে কি তার সে ইবাদত “ইবাদত” বলে গন্য হবে? আল্লাহর দরবারে কি তা কবুল হবে? মা বাবার আদেশ পালনই যেখানে বড়ো ইবাদত, সে ইবাদতকে বাদ দিয়ে কেউ কি ইহলৌকিক ও পারলৌকিক শান্তি পেতে পারে?

মা বাবার প্রতি আনুগত্যহীন কোনো ব্যাক্তি যতোই ধর্মের গান গাক সে কখনো প্রকৃত ধার্মিক হতে পারেনা। সে হয় বকধার্মিক। এসব বকধার্মিকরা নিজেদের প্রয়োজনে ধর্মকে ইচ্ছে মাফিক ব্যবহার করে থাকে। নিজেদেরকে বেহেশতের ঠিকাদার হিসেবে জাহির করে। জাহিরকৃত এ ঠিকাদারদের উদ্দেশ্যে আমি তাই বলতে চাই, বেহেশত আল্লাহর আসমানে নেই, আরশেও নেই। বেহেশত আছে মা বাবার হাসিমাখা বদনে, আছে তাদের পদতলে।

লেখক- কবি ও প্রাবন্ধিক

Facebook Comments Box