অনিয়ন্ত্রিত মন – হামিদুল নাসির

0
458
Hamidul_Nasir_oniyontrito_mon

অনিয়ন্ত্রিত মন
হামিদুল নাসির


আজ খুব সুন্দর দিন। সূর্যটা যদি আকাশের মেঘ কে ভেদ করে উকি দিতে সক্ষম হয় তাহলেই দ্বীপ রাষ্ট্র আয়ারল্যান্ড হেসে দিয়ে জ্যোতি ছড়ায়। কন কনে শীতে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রার সূর্য রশ্নিতে চিকচিক করা আজকের দুপুর মহুর্তেই মনের গহিনে জমাট বাঁধা দুঃখ ব্যাথা ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে যায়।

মনে হচ্ছে জানালার ফাঁক দিয়ে সূর্যের কিরণ আমার গায়ে জড়িয়ে যায়। জমাট বাঁধা দুঃখ বেদনার স্তুপে চাপা পড়া সুখ অনুভূতি জেগে উঠে। সূর্যস্নান করতে ব্যাকুল হয়ে যায় মন।

আমাদের মনটা আসলে কি সেটা আমরা জানিনা। মানুষের এই মনকে নিয়ন্ত্রিত করার ক্ষমতা আমাদের নেই। যারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তারা আসলে সাধু বা মহান ব্যাক্তি। অনিয়ন্ত্রিত মন আমাদের ইচ্ছা শক্তি বাড়িয়ে দেয়। ব্রেন কে নিয়ন্ত্রন করে ফেলে। আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক বিজ্ঞ মানুষ মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে অনেক পরামর্শ দিয়েছেন। মন যদি সচল না থাকে তাহলে কোন কাজ সফল ভাবে করা সম্ভব নয়। মন নিয়ন্ত্রিত না থাকলে কাজে মনযোগী হওয়া যায় না আর অমনোযোগী কাজ কখনো সফল ভাবে সমাপ্ত করা যায় না। অসমাপ্ত কাজের ফলাফল শূন্য। প্রতিটি কাজের সফল সমাপ্তী হল জীবনের সফলতা। মনকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে কয়েকটি ফর্মুলার কথা বলেছেন বিজ্ঞ জনেরা। যেমন ১. মেডিটেশন করা ২. শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম করা ৩। চিন্তাকে চিহ্নিত করা ৪. মনকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়া ৫. সংগীত থেরাপি অর্থাৎ গান শোনা ৬. মোমের আলোতে তাকিয়ে থাকা ৭. আশাবাদী হয়ে উঠা ৮. পর্যাপ্ত ঘুম ৮. মানবিক চিন্তা করা ৯. হাসি-খুশি থাকা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা আমাদের অনেক বার মন বা নফসকে নিয়ন্ত্রন করার তাগিদ দিয়েছেন। নফসের কারনেই মানুষ সকল ভাল এবং মন্দ কাজে লিপ্ত হয়।

নফসের বা মনের তাড়নায় নিজেকে খারাপ অশ্লীল আলোচনা ও কুকাজে নিয়োজিত করলে দুনিয়ায় বিশেষ ৩টি ক্ষতিতে পতিত হয়। তা হলো

১. মানুষের চেহারার সৌন্দর্য ও আকর্ষণ নষ্ট হয়ে যায়।
২. মানুষের উপর অভাব অনটন চেপে বসে।
৩. মানুষের হায়াৎ কমে যায়।

তাই নফসের যাবতীয় কুধারণা থেকে মুক্ত থাকা জরুরী। নফসের কুধারণা ও তাড়না থেকে মুক্ত থাকতে বেশি বেশি তাওবা-ইস্তেগফার করা জরুরী। আল্লাহর কাছে তাওবাহ ও ইস্তেগফারই মানুষকে নফসের কুধারণা ও ক্ষতি থেকে মুক্ত রাখতে পারে। তাই বেশি বেশি এ ইস্তেগফার করা-

রাব্বিগ ফিরলি ওয়া তুব আলাইয়্যা ইন্নাকা (আংতাত) তাওয়্যাবুর রাহিম।

হে আমার প্রভু! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবাহ কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়।ঽ

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে বসে এক বৈঠকেই এই দোয়া ১০০ বার পড়েছেন। (আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, তিরমিজি, মিশকাত)

আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত সকল ফর্মুলার চেয়ে আমার কাছে নামাজ বা সালাত হল মনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার সবচেয়ে বড় ফর্মুলা। নিয়মিত সালাত আদায়ের মাধ্যমেই নিজেকে নিয়ন্ত্রন রাখা এবং ভাল কাজের প্রতি মনোযোগ দেওয়া সম্ভব।

লকডাউনের ফলে সবার মত আমার মনটাও বিষন্নতার গেরাকলে ঘুরপাক খাচ্ছে। আইরিশ আবহাওয়ার মত এই রোদআর এই বৃষ্টির মত। রৌদ্রের ঝিলিক দেখে বাহির হলেই কাকভেজা হয়ে মহুর্তেই ফিরে আসতে হয়। অলস সময়ের প্রতিটি মহুর্ত ভাল লাগার অন্তিম সুখ অনুভুতির ছোঁয়ার রেশ কাটিয়ে উঠতেই যন্ত্রনার ঢেউ এসে আগমন করে। হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় অন্ধকার কালিমা লেপন করে দেয়। ভাবনার জগত কে ঘূর্নিঝড়ের থাবায় দুমড়ে মুচড়ে এলোমেলো করে দেয়। মনকে যদি নিয়ন্ত্রণ করা যেত তাহলে এই ঘূর্নিঝড়কে থামিয়ে সুখের ভেলায় ভেসে ভেসে সুখকে আলিংগন করতাম।

কবিতা পড়ি। গান শুনি, গল্প পড়ি কিন্তু এখন আর অন্তরে নাড়া দেয় না। ছোট বেলায় দেশে আমাদের কবিরা যে বৃষ্টি আর শীতের কবিতা আর গান লিখে আমাদের মনে ভালবাসার আল্পনা এঁকে দিয়েছিল, সেই আল্পনা আমার অন্তরে স্থির চিত্র ধারন করেছে।

গ্রামের মেঠো পথ, বাড়ির আঙিনায় গল্পের তাড়না, পুকুর ভরা মাছ, পশু পাখির কিচিরমিচির শব্দ, কৃষক কৃষাণীর অভুক্ত ভালবাসা, রৌদ্রের খরতাপে ঘর্মাক্ত শরীর, চায়ের স্টল আনন্দিত আড্ডা আমার জীবনের মধুময় সুখের স্মৃতি। সবুজ ফসলের মনোরম দৃশ্য। বর্ষার জল খেলা। থৈথৈ পানির চাদরে নৌকায় চড়ে মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি গানের সুর। ঘোমটা দিয়ে নব বধুর নাইওরি যাওয়ার আবেগ ভালবাসাই আমার ভালবাসা।

সময়ের ব্যাবধানে মহাসমুদ্রে হারিয়ে যাওয়া নাবিকের মত পথ হারিয়ে অজানা এক দ্বীপে চলে আসা আমি। জীবনের যত সুর তাল সব হারিয়ে গেছে। এখন আর কেউ গান গায় না এই বৃষ্টি ভেজা রাতে। বাড়ির ছাদ নেই, উঠান নেই, বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দ পায়না, দল বেধে বৃষ্টির তালে তালে নাচ করে না। টাপুর টুপুর বৃষ্টির শব্দে প্রেমিক প্রেমিকার মনে ভালবাসার আল্পনা আকেনা। শীতের পিঠার উৎসব নেই। শীতের আগমনী সময়ের সাথে সাথে গান লিখে না। গ্রীষ্মের খরতাপ নিয়ে গান হয়। সূর্যের প্রখরতার প্রতিক্ষায় প্রহর গুনে।

সৃষ্টির অপরুপ মিলন মেলায় আমি হারিয়ে গেছি। সময়ের পেছনে আমি দাঁড়িয়ে আছি। আমার অস্তিত্ব মিশে গেছে অজানা এক রহস্যে ঘেরা জীবনের সাথে। মনে হয় সঞ্জিব চট্রোপধ্যায় আমার জন্যই লিখে ছিলেন, বন্যেরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে।

আমি বনের মানুষ। হৈ হুল্লোড় কাদা মাটি আমার জীবন। সেন্ট্রাল হিটিং আরাম গালিচা আমার নয়। তপ্ত গরমে খোলা জানালায় মৃদু দখিনা হাওয়া আমায় পিছু টানে। গোল্লাছুট কানামাছি আমার ভালবাসার খেলা। শুকনো রুটি আলো বাজি আর সড়পুটির ঝুল আমার আয়েশি খাদ্য। মায়ের আচল আমার ভালবাসার সমুদ্র সৈকত। যেখানে অগ্নিদাহ দেহকে নিমিষেই শীতল করে দেয় মন প্রাণ । জোৎস্নার আলো ছড়িয়ে আলোকিত করে, অন্ধকারের ছায়া পথকে জয় করে নেয়।

জানালার সূর্য রশ্নি দীর্ঘকায় গাছগুলোর ভেতর দিয়ে আলোর খেলায় আমাকে কাছে টানে। গাছগুলি শীতের তীব্রতায় সবুজ পাতা গুলিকে হারিয়ে উলংগ হয়ে আমার মতই অসহায়। মনে হয় আলোর সাথে মহা মিলনে লিপ্ত হয়ে ফিরে পাবে তাদের আবরন সবুজ পাতা। বিবস্র দেহের গাছের কান্না আমি যেন শুনতে পাই। গাছ ও মানুষের মধ্যে এক পবিত্র সম্পর্ক। বেচে থাকার জন্য এই পবিত্র সম্পর্ককে আমি কি শ্রদ্ধা করি? মানুষ হিসাবে আমি কি খুব স্বার্থপর? যে গাছ আমাকে বেঁচে থাকার অক্সিজেন দেয়, ফল মুল দেয়, বাড়ি ঘর আসবাবপত্র তৈরি করার জন্য সহায়তা করে, আমরা তাদের জন্য কি করি?

আবেগতাড়িত মানব সভ্যতার অপরিণত বুদ্ধি আমায় গ্রাস করেছে। মেঘাচ্ছন্ন আকাশ আর সুর্যের আলোকচিত্র আমার মনকে প্রভাবিত করছে? পাওয়া না পাওয়ার মোহে আমি নিমজ্জমান। ভুলে যাই আমার সত্যের সন্ধান। নিজের মনের শাসন আমিই করতে চাই। প্রভুর প্রতি ভালবাসা আর শ্রদ্ধায় যদি মাথা নত করি তাহলে সূর্যস্নান ও প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়া উচিত। সৃষ্টির সেরা জীব হিসাবে আমার শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করা উচিত। লোভ লালসা পরিহার করে, দাম্ভিকতার দেয়ালকে ভেংগে চুর্নবিচুর্ন করে নমনীয়তা আর ভালবাসার জলপ্রপাত ছড়িয়ে নিজেকে আলোকিত করা সম্ভব। স্রষ্টার সৃষ্টির অগাধ বিশ্বাস আর আরাধনার মাধ্যমে তা সম্ভব। পবিত্র আল কোরানে আল্লাহ বলেছেন,

হে মানুষ! তোমাদের ওপর আমার নিয়ামতকে তোমরা স্মরণ করো। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো শ্রষ্ঠা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিজিক দেবে? তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। অতএব তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে? –সূরা ফাতির: ৩

আল কোরানের এই বানীকে অবধাবন করলেই সকল হতাশা আর ক্লান্তি দূর করে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রিত করে সুন্দর জীবন ও আনন্দিত সময়কে গতিশীল করে সকল না পাওয়ার গ্লানি ভুলে নিজের মনকে নিয়ন্ত্রিত করা উচিত।

Facebook Comments Box